রোম্যান্সকে বড় পর্দায় ফিরিয়ে এনেছে মোহিত সুরির ‘সইয়ারা’। ওদিকে অনুরাগ বসুর ‘মেট্রো ইন দিনো’ ভালবাসার গল্পকে এক নতুন স্বাদে হাজির করেছে দর্শকদের সামনে। এবার দর্শকদের জন্য এই বছর বিশেষ চমক অপেক্ষা করছে। বহু প্রজন্ম ধরে বলিউডে প্রেমই ছিল সিনেমার হৃদস্পন্দন। শাহরুখ খানের বিখ্যাত সংলাপ “পেয়ার দোস্তি হ্যায়” এখনও সেই আবহকে মনে করিয়ে দেয়।
গত কয়েক বছর বলিউডের পর্দা ভরেছিল রক্ত, ঘাম আর হাই-অকটেন স্টান্টে। পুষ্পা (২০২৪), কেজিএফ (২০২২), পাঠান (২০২৩), জওয়ান (২০২৩), জেলার (২০২৩), মার্কো (২০২৪) ছবিতে নায়কেরা গাড়ি উড়িয়েছে, থ্রিলার গল্পে দর্শকরা ডুবে গিয়েছে অন্ধকার জগতে। তখন মনে হচ্ছিল, প্রেমের সিনেমা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎই নতুন হাওয়া বইল, প্রেম আবার ধীরে ধীরে হলে ফিরল। ‘আঁখোঁ কি গুসতাখিয়াঁ’, ‘সইয়ারা’, ‘মেট্রো ইন দিনো’ আর এখন ‘পরম সুন্দরী’ প্রমাণ করছে গোলাপ, বেহালা আর চুরি করা চোখের চাওয়া এখনও বিক্রি হয়, বরং হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
পরিচালক তুষার জলোটার নতুন ছবি ‘পরম সুন্দরী’–তে অভিনয় করছেন সিদ্ধার্থ মালহোত্রা ও জাহ্নবী কাপুর। তিনি বললেন, প্রেম কখনও হারায়নি, শুধু সময় ও রুচির সঙ্গে বদলেছে। “হৃদয় থেকে বলা গল্প দর্শকের মনে পৌঁছে যায়। আমাদের উদ্দেশ্যও সেটাই।”
তুষার জলোটা আরও যোগ করলেন, “পরম সুন্দরী–তে আমি সেই নিষ্পাপ অনুভূতি ও গভীরতাকে ফিরিয়ে আনতে চাই, যা আমরা বড় হয়ে উঠতে দেখেছি। তবে এর সঙ্গে আজকের প্রজন্মের জন্য নতুনত্বও রেখেছি। সিদ্ধার্থ-জাহ্নবীর রসায়ন দারুণ, আর গান নস্টালজিয়া জাগিয়েও একেবারে আধুনিক।”
অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠী ‘মেট্রো ইন দিনো’তে এক মধ্যবয়সীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি বিবাহিত জীবনের টানাপোড়েন সামলাচ্ছেন। তুষার জলোটা মনে করেন, প্রেম সবসময়ই সিনেমার পুরনো আকর্ষণ এবং সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, “ভালবাসা সবসময় অমর। আসল ব্যাপার হল গল্প কতটা দর্শকের মনের কাছাকাছি হয়। মেট্রো ইন দিনো–তে বিভিন্ন বয়সের প্রেম দেখানো হয়েছে, সেটাই এটাকে বিশেষ করেছে।” নিজের রোম্যান্স নিয়ে মজার ছলে তুষার জলোটার বলেন, স্ত্রীকে ফুল দেওয়া তার স্টাইল নয়। “আমার রোম্যান্সের নিজস্ব আকর্ষণ আছে। এমনকী একটু সমাজতন্ত্রও আছে আমার প্রেমে,” হাসতে হাসতে বললেন তিনি।
তাহলে হঠাৎ প্রেম ফেরার কারণ কী? দর্শকের উষ্ণতার খিদে? আবেগময় গল্পের প্রতি ফিরে আসা? নাকি শুধু নস্টালজিয়ার টান? অভিনেতা রোহন গুরবক্সানি (খো গয়ে হম কাহান – ২০২৩, রকি অর রানি কি প্রেম কাহানি – ২০২৩, মেট্রো ইন দিনো) বিশ্বাস করেন, প্রেমের ঢেউ মানে শুধু পুরনো ঘরানা নয়, বরং সিনেমার শিল্পকলা পুনর্আবিষ্কার। তিনি বলেন, “সাইয়ারা প্রমাণ করেছে অভিনয়, নির্দেশনা, সঙ্গীত, সম্পাদনা আর লেখনি একসঙ্গে মিলে গেলে দর্শকের হৃদয় ছোঁয়া সম্ভব। এটি কোনও ফর্মুলা নয়, বরং সঠিক মিলনের ফল।”
আহান পান্ডে ও অনীত পাড্ডা অভিনীত সইয়ারা–র সাফল্য ছিল গেম-চেঞ্জার। নতুন মুখ নিয়েও ছবিটি বক্স অফিস কাঁপিয়েছে। বার্তাটি স্পষ্ট, দর্শক রোম্যান্স চায়। তবে এবারকার প্রেমের গল্পগুলো আরও পরিণত, বাস্তব, আর আধুনিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
ট্রেড অ্যানালিস্ট রোহিত জয়সওয়াল বললেন, প্রেমের গল্প সবসময়ই দর্শকের প্রথম পছন্দ। “অ্যাকশন আলো কেড়ে নিলেও প্রেমের ছবি সবসময় অদ্বিতীয়। কম বাজেটে হয়, ঝুঁকি কম, আর ভাল হলে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, গত কয়েক বছর দর্শক বেশি ঝুঁকেছিল দক্ষিণী কনটেন্টের দিকে, যেখানে অ্যাকশন প্রধান ছিল। বলিউডও সেই ট্রেন্ড অনুসরণ করেছিল। কিন্তু এখন দর্শক ক্লান্ত। তাই প্রেম আবার উজ্জ্বল।”
প্রযোজক আনন্দ পণ্ডিত (বিগ বুল– ২০২১, চেহরে– ২০২১, থ্যাঙ্ক গড– ২০২২) মনে করেন, ভারতীয় দর্শক চিরকালই প্রেমের সিনেমার ভক্ত। আজকের ডিজিটাল যুগে আবেগের অভাব রয়েছে, তাই দর্শক হৃদয়ছোঁয়া গল্প খুঁজছে। কোরিয়ান নাটকের জনপ্রিয়তাও সেটাই প্রমাণ করে। তিনি বলেন, “প্রতিটি প্রজন্মই আওয়ারা, মুঘল-এ-আজম, ববি, এক দুজে কে লিয়ে-র মতো প্রেমের গল্পে বড় হয়েছে। প্রেমের আকর্ষণ কখনও ফিকে হবে না।”
পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর সোজাসাপ্টা মন্তব্য, আজকের সমস্যার একটি হল তরুণ নায়কের অভাব। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “ভাল হয়েছে আহান পান্ডে আর অনীত পাড্ডা এসেছেন। এখনকার নায়কেরা প্রায় সবাই ৬০–এর ওপরে, অথচ প্রেমের ছবির জন্য দরকার তরুণ রক্ত।” তবে তিনি স্বীকার করেন, নিজে রোম্যান্স ঘরানার ছবি তৈরি করতে পারবেন না।
