বছরের পর বছর অপেক্ষার পর অবশেষে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার স্বপ্নপূরণ করেছিলেন কেরলের ত্রিচুরের ডাক্তার সুজয় সিধান। ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এ বছর আবার শুরু হয়েছে এই বিখ্যাত তীর্থযাত্রা। কিন্তু তাঁর যাত্রাপথে এমন এক বিপদ এসে দাঁড়িয়েছে, যা তিনি কখনও ভাবেননি। নেপালে ব্যাপক বিক্ষোভ, সহিংসতা আর কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের কারণে এখন তিনি ও শত শত ভারতীয় তীর্থযাত্রী তিব্বতের দ্রাচেনে আটকে পড়েছেন।
৬ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত দ্রাচেন কৈলাস যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। সিধান জানিয়েছেন, এই ছোট্ট শহরে থাকার ব্যবস্থা খুবই সীমিত। সাধারণত যাঁরা কৈলাস প্রদক্ষিণ শেষে ফেরেন, তাঁদের শারীরিক অসুস্থতা কাটাতে অক্সিজেনযুক্ত কক্ষ দরকার হয়। কিন্তু এখন যাঁরা যাত্রা শেষ করেও ফিরে যেতে পারছেন না, তাদের থাকার কারণে জায়গার অভাব হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাঁদের নেপাল-চিন সীমান্তের আরও ছোট ছোট শহরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সিধানের কথায়, “আমরা জানি না সামনে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।”
তাঁদের যাত্রা শুরু হয়েছিল লখনউ থেকে। প্রাইভেট ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে নেপালের নেপালগঞ্জে পৌঁছে সেখান থেকে ছোট বিমানে নেপালের হিলসা এবং পরে হেলিকপ্টারে দ্রাচেনে যান। তিন দিন আগে সেখানে পৌঁছনোর পর মঙ্গলবার পরিক্রমা শেষ করতেই নেপালে হিংসা ছড়ায়, সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তাঁরা এখন আটকে পড়েছেন।
মনে করা হচ্ছে, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার তীর্থযাত্রী, যাদের বেশিরভাগই ভারতীয়, দ্রাচেনে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থা, অক্সিজেনের ঘাটতি আর সংকীর্ণ থাকার জায়গা নিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
ত্রিচুরের আরেক যাত্রী, স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা অভিলাষ সতীশ জানান, দ্রাচেনে সর্বোচ্চ ৫০০ মানুষ থাকা সম্ভব। তিনি বলেন, “যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে যাত্রীরা আসা-যাওয়া করেন, তাহলে সমস্যা হয় না। কিন্তু কেউ সময়ের বেশি থেকে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।” নিজে দ্রাচেনে পৌঁছেই মাথা ঘোরার সমস্যা শুরু হওয়ায় অক্সিজেন নিতে হয়েছিল। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভিড় বাড়লে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সরবরাহও বন্ধ হতে পারে।
দ্রাচেন থেকে সবথেকে কাছের নিচু উচ্চতার জায়গা নেপালে হলেও, সেখানকার সীমান্ত আপাতত বন্ধ। ফলে যাত্রীরা চরম সমস্যায় রয়েছেন। ভারতীয় হাইকমিশন বেজিংয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে সূত্রের খবর। ভারত সরকার এ বছর চিনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সরকারি উদ্যোগে ৭৫০ জন যাত্রীকে সিকিম ও উত্তরাখণ্ডের নির্দিষ্ট পথ দিয়ে পাঠিয়েছিল। কিন্তু হাজার হাজার যাত্রী বেসরকারি ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে গিয়েছেন, যাঁদের রুট নেপালের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিকল্প পথও নেই।
সিধান জানিয়েছেন, স্থানীয় গাইড বা সমন্বয়কারীরা তেমন কোনও সমাধান দিতে পারছেন না। প্রতিনিয়ত নতুন যাত্রী পরিক্রমা শেষে ফিরছেন, ফলে চাপ বাড়ছে। মঙ্গলবার দিল্লি থেকে ফোন পেলেও এরপর আর কোনও খবর পাননি। এখন তাঁরা ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রকের সহায়তা চাইছেন।
বুধবার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে কয়েকজনকে চার ঘণ্টার বাসযাত্রার পর ছোট ছোট দলে ভাগ করে হিলসায় আনা হয়েছে। সতীশ জানিয়েছেন, বুধবার সন্ধ্যায় তিনি হিলসায় ছিলেন। কিন্তু এখানেও ভিড় বাড়ছে। তাঁর মতে, হিলসা একটি ছোট শহর। যদি আসা আর যাওয়ার যাত্রীরা একসঙ্গে জড়ো হন, তাহলে চরম বিপদ তৈরি হবে।
