দিব্যেন্দু মজুমদার, হুগলি
সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যখন বাংলা ও বাঙালির নিজস্বতা ও স্বতন্ত্র সত্ত্বাকে আঘাতের প্রচেষ্টা চলছে তখন কোন্নগরের ঘোষাল বাড়ির পুজোয় বাংলা ও বাঙালির অস্মিতাকে রক্ষার শপথ নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। ৫৭১তম বর্ষে পা দিচ্ছে ঘোষাল বাড়ির দুর্গাপুজো। আর এই পুজোয় নাট মন্দিরে মায়ের সামনেই পরিবারের সদস্যরা একটি ছোট্ট প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে বাংলা ও বাঙালির অস্মিতা রক্ষার নাটক মঞ্চস্থ করবেন। তার জন্য জোর কদমে নিয়মিত রিহার্সাল চলছে নাট মন্দিরে। ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঘোষাল বাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন গৃহকর্তা আশুতোষ ঘোষাল।
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে পাঞ্জা নিয়ে কোন্নগরে জমিদারি পত্তন করেছিলেন ঘোষালরা। সেই সময় থেকেই বাংলার মানুষের সুখ দুঃখের অংশীদার হয়ে গিয়েছিলেন এই পরিবারের সদস্যরা। এই পরিবারের সদস্য বিশিষ্ট সাংবাদিক-রাজনীতিক প্রবীর ঘোষাল জানান, তাদের পরিবারের এই পুজোয় ব্রিটিশরাও রীতিমতো উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন। আর এই পুজোকে কেন্দ্র করে তখন গ্রামের বিপুল সংখ্যক মানুষ একত্রিত হতেন যা বাঙালির সংস্কৃতির একটা দিক নির্দেশ করে। ব্রিটিশরাও সেই সময় রীতিমতো উৎসাহিত হয়ে এই পুজোয় দুই ধাপে ৭৫০ টাকা করে মোট ১৫০০ টাকা অনুদান দিতেন। এই অনুদানের টাকায় গ্রামের সমস্ত মানুষকে সেই সময় পুজোর চার দিন পেট পুরে খাওয়ানো হত। গ্রামের মানুষকে খাওয়ানোর পর যে টাকা বেঁচে যেত সেই টাকা শ্রীরামপুর ট্রেজারিতে ফেরত পাঠানো হত। সেই অনুদানের টাকা আজও আসে, কিন্তু তা নেওয়া হয় না। বিদেশি হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশরাও বাংলা ও বাঙালির অস্মিতাকে যেখানে সম্মান করেছে সেখানে আজ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বাঙালির আত্মসম্মানে আঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে ঘোষাল পরিবার।
এই পরিবারের পুজোর যিনি প্রচলন করেছিলেন সেই আশুতোষ ঘোষাল স্বপ্নে দেখেন তাদের আদি বাড়ির পিছনে একটি নিম গাছের ডালে স্বয়ং নারায়ণরূপী শিলা বিরাজ করছে। সেই নারায়ণ শিলা উদ্ধার করার পর গ্রামের প্রজারাই পুজো করার জন্য অনুরোধ জানান। এরপর আশুতোষ বাবু একদিন মায়ের স্বপ্নাদেশ পান। মা তাকে স্বপ্নে বলেন নারায়ণকে বাহন করেই যেন মায়ের পুজো করা হয়। সেই স্বপ্নাদেশ অনুসারে মায়ের পুজোর প্রচলন হয় যা আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে চলেছে। আর ঐতিহ্যবাহী এই পুজোকে কেন্দ্র করে পুজোর চার দিন পরিবারের সমস্ত সদস্য একত্রিত হন এবং পুজোর আনন্দে মেতে ওঠেন আজও।
এই পুজোর বিশেষত্ব হল বাইরে তৈরি কোনও মিষ্টান্ন মাকে নিবেদন করা হয় না। পরিবারের মেয়ে ও গৃহবধূরা বাড়িতেই নারকেলের বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরি করে মাকে নিবেদন করেন। সন্ধিপুজোয় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কলাপাতার এক ধরনের প্রকোষ্ঠ তৈরি করে প্রদীপ জ্বালান। পাশাপাশি পুজোর এই চার দিন পরিবারের সকল সদস্য নাট মন্দিরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন যা দেখতে ভিড় জমান এলাকার বহু মানুষ। প্রবীর ঘোষাল জানান, বাড়ির এই নাট মন্দিরে বড়ে গোলাম আলি থেকে শুরু করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সহ বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ সংগীত পরিবেশন করে গেছেন। কোভিডের আগের বছরও পন্ডিত গোবিন্দ বসু তবলা লহরা করে গেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। বর্তমানে বারোয়ারি পুজোর মতোই তাদের এই পুজোয় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। তাই আগের মতো চার দিন ধরে নাট মন্দিরে এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। এখন পুজোর একটা দিন বেছে নেওয়া হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য। এবারে তারা অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বাংলা ভাষার প্রতি যে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে এবং যে ভাষা-সন্ত্রাস চলছে তারই প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে ‘বাংলা ও বাঙালির অস্মিতা’ নাটক মঞ্চস্থ করবেন। আর এই নাটকের মধ্য দিয়েই বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো চরিত্রের প্রকাশ ঘটবে। তাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে এবছর তাদের পুজোয় বাংলা ও বাঙালির অস্মিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারই প্রস্তুতি চলেছে জোরকদমে।
দশমীর দিন বাড়ির বউরা পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ মুখে দিয়ে মাকে বরণ করার পর সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। তারপর দুপুরের মধ্যেই গঙ্গায় মায়ের বিসর্জন হয়। জানা যায়, বহু বছর আগে সন্ধের সময় নৌকো করে মায়ের বিসর্জন হত। সেই সময় ওই এলাকা ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। একবার বিসর্জনের সময় একজনকে বাঘে টেনে নিয়ে যায়। তারপর থেকে এই পরিবারে দিনের বেলা বিসর্জন প্রথা চালু হয়। সর্বোপরি এই দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় মানুষের সমাগমে গোটা ঘোষাল বাড়ি যেন এক মিলন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
