অসম হারাল শুধু এক সংগীতশিল্পীকে নয়, বরং এক আবেগকে। জুবিন গর্গ গায়ক, সুরকার, গীতিকার ও অভিনেতা, যাঁকে ভক্তরা প্রায়ই ‘অসমের আত্মা’র প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করতেন। শুক্রবার সিঙ্গাপুরের সমুদ্রে স্কুবা ডাইভিং দুর্ঘটনায় ৫২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখানে তিনি ‘নর্থ ইস্ট ফেস্টিভাল’-এ ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, ওই দিনই তাঁর মঞ্চে অনুষ্ঠান করার কথাও ছিল।
সংগীতে তিন দশকের শাসন
বিয়ে থেকে আন্দোলন, বিহু, ভাওনা থেকে ভক্তিসঙ্গীত, অসমের কোনও অনুষ্ঠানই জুবিনের গান ছাড়া পূর্ণতা পেত না। টানা তিন দশক তিনি শাসন করেছেন অসমের সঙ্গীত জগত। কেবল গানে নয়, অভিনয়েও রেখেছেন ছাপ। পরিচালক রূপক গগৈ বলেন, “অসমের সিনেমা যখন মন্দার মধ্যে, তখন জুবিনের ‘মিশন চায়না’ (২০১৭) হলে ফিরিয়ে এনেছিল দর্শককে।”
২০০০ সালে ‘তুমি মোর মাথু মোর’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করলেও বড় সাফল্য পাননি। তবে ধীরে ধীরে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ২০১৭ সালে মিশন চায়না ও ২০১৯ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা, দুটি ব্লকবাস্টার ছবি তৈরি করেন। এরপর আসে ড. বেজবড়ুয়া ২ (২০২৩)।
আন্দোলনের কণ্ঠস্বর
শুধু শিল্পী নয়, আন্দোলনের মুখও ছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে অসমে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলেন জুবিন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমি মরব কিন্তু সিএএ মেনে নেব না।” রাজনীতির পথে হাঁটেননি কখনও, শিল্পের মাধ্যমেই প্রতিরোধ চালিয়ে গেছেন।
২০২০-তে কোভিডের সময় নিজের দুতলা বাড়ি কোভিড কেয়ার সেন্টার হিসেবে দিয়েছিলেন। এর অনেক আগেই তাঁর অ্যালবাম শিশু (২০০২) এবং যন্ত্র (২০০৪) অসমের সমাজ-সংকটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল।
বলিউডেও ছাপ
গুয়াহাটির পাশাপাশি মুম্বই-এও সমান সক্রিয় ছিলেন তিনি। বলিউডে হিট গান ইয়া আলি (গ্যাংস্টার, ২০০৬), জানে কেয়া (শাদি কে সাইড এফেক্টস, ২০০৬), ও দিলরুবা (নমস্তে লন্ডন, ২০০৭) তাঁকে জাতীয় স্বীকৃতি এনে দেয়। ইয়া আলি গানের জন্য স্টারডাস্ট পুরস্কার পান, ফিল্মফেয়ার মনোনয়নও আসে তাঁর ঝুলিতে।
পুরস্কার ও সম্মান
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে শুরু করে একাধিক রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে। ২০২৪ সালে মেঘালয়ের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি তাঁকে সম্মানীয় ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করে।
সংস্কৃতির সেতুবন্ধন
জাত-ধর্মের বিভাজনকে অগ্রাহ্য করে সমান উদ্যমে তিনি গেয়েছেন নাম-সংকীর্তন ও সুফি প্রভাবিত জিকির। ভক্তরা কখনও মালা দিয়ে, কখনও প্রণাম করে তাঁকে বরণ করেছেন।
২০২০ সালে তিনসুকিয়ার থেপাবাড়ি গ্রামে তাঁর নামে বাঁশের সেতুর নামকরণ হয়। ২০২৩ সালে ডিগবয়-এ নিজেই উদ্বোধন করেন নিজের ২০ ফুট মূর্তি।
শেষ কাজ
অক্টোবর মাসে মুক্তি পেতে চলেছে তাঁর শেষ ছবি ‘রই রই বিনালে’, যা অসমের প্রথম মিউজিক্যাল সিনেমা।
জুবিন গর্গের মৃত্যুতে অসম সহ গোটা দেশ শোকস্তব্ধ। এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হলেও তাঁর গান, তাঁর আবেগ চিরকাল বেঁচে থাকবে।

