
ক্রমাগত ভারী বৃষ্টিপাত এবং একের পর এক প্লাবনের ধাক্কায় কালিম্পং-এর তিস্তা নদীর তীরবর্তী কৃষ্ণগ্রাম এবং গফুর বস্তি একরকম জনশূন্য। গত ২ বছর ধরে পরপর বন্যা এবং ভূমিধসের কারণে তিস্তাবাজার সংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দারা তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ছবির মতো চোখ জুড়নো গ্রাম দুটি ক্রমশই ভুতুড়ে গ্রামে পরিণত হয়েছে।
তিস্তাবাজার এলাকায় কৃষ্ণগ্রাম এবং গফুর বস্তি। শিলিগুড়ি থেকে তিস্তাবাজারের সড়কপথের দূরত্ব মেরেকেটে ৫৩ কিলোমিটার। ১০ মাইল নামেও পরিচিত তিস্তাবাজার বিখ্যাত তার হোয়াইট রিভার রাফটিং, কায়কিং এবং অ্যাঙ্গলিং-এর কারণে। এছাড়া হস্তশিল্পের বিশাল সামগ্রী কেনাকাটার টানে আসেন হাজার হাজার পর্যটক।
প্রথম বড় ধাক্কা এসেছিল সেই ২০২৩ সালের অক্টোবরে। সিকিমের হিমবাহ হ্রদ (Glacial Lake Outburst) বিস্ফোরণের ফলে তৈরি আকস্মিক বন্যা তিস্তা নদীর দু-ধার প্লাবিত করেছিল। বন্যার জলে কৃষ্ণগ্রামের ৪০ টিরও বেশি বাড়িতে ফাটল দেখা দেয়। সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে যায় গ্রামের চারটি বাড়ি। তখন থেকেই গ্রামের বাসিন্দারা প্রথমে তিস্তা ব্রিজ হাই স্কুল এবং পরে একটি কমিউনিটি হলে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।
দু-হাজার পঁচিশের ৪ এবং ৫ অক্টোবরের ভারী বৃষ্টিপাত ফিরিয়ে এনেছে বছর দুই আগের সেই ভয়াবহ স্মৃতি। তিস্তার নিম্ন অববাহিকায় থাকার কারণে এই অঞ্চটি এবারও প্লাবিত হয়েছে। কমবেশি ২৪ মাস ধরে কৃষ্ণগ্রাম এবং গফুর বস্তির প্রায় এক হাজার মানুষ তাঁদের জমি এবং জীবিকা ধরে রাখার জন্য লড়াই করেছেন। কিন্তু উপর্যুপরি বন্যা এবং ভূমিধস তাঁদের সেই লড়াইকে ক্রমশই কঠিন করে দিয়েছে। ফলস্বরূপ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাসিন্দাদের বেশিরভাগই এখন নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন।
গফুর বস্তির ৩১ জন বাসিন্দার বর্তমান ঠিকানা কমিউনিটি হল। ২০২৩ সালের বন্যায় ১১টি বাড়ি ভেসে যায় এই বস্তিতে। অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনও প্যাকেজই পাননি ভুক্তভোগীরা। কমিউনিটি হলে থাকা এক গ্রামবাসী বলেছেন, “গ্রামের প্রায় ৮০% মানুষ এখন শহরের কাছাকাছি ভাড়া বাড়িতে থাকে। সেখানে প্রতি মাসে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। তা সত্ত্বেও শ্রমিক, ভেলা গাইড বা বালি সংগ্রহের কাজ করার সুযোগ থাকায় শহরের দিকেই চলে যাচ্ছে অধিকাংশ বাসিন্দা।”
কালিম্পংয়ের জেলাশাসক টি বালা সুব্রহ্মণ্যম জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে পলি অপসারণের কাজ চলছে, তবে আরও বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যথায়, পরবর্তী ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে নুড়ি-পাথরের পলি আবার ফিরে আসবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের জন্য জরিপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে জমি বরাদ্দ এখনও প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেছেন, “কাছাকাছি সরকারি জমি খুঁজে পাওয়া একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ গ্রামের মানুষ বেশি দূরে যেতে চান না।”

