
২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেল বাতিল আর ২০১৪ সালের প্রাথমিক নিয়োগের ৩২ হাজার চাকরি বহাল একই রাজ্যে, একই সময়ের দুই বিশাল রায়, কিন্তু ফলাফল ঠিক দু’টি ভিন্ন নদীর মতো দুই দিক দিয়ে বয়ে গেল। কেউ হারাল চাকরি, কেউ ফিরে পেল জীবনের আলো। ঠিক কোথায় এই দুই রায়ের ফারাক? সেই উত্তরেই এখন তোলপাড় শাসন–বিরোধী মহল, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আদালত ভবন।
২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ বাতিলের ঘটনায় ভরাডুবি ছিল কঠোর, নির্মম। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে ছিল বারবার উঠে আসা দুর্নীতি, টাকা লেনদেন, যোগ্য–অযোগ্যকে আলাদা করে দেখাতে ব্যর্থতা। আদালত বলেছিল, জালিয়াতিকে কখনওই বৈধতা দেওয়া যায় না। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি যখন প্রমাণিত, তখন পুরো নিয়োগই কলুষিত। ফলে পুরো প্যানেল বাতিল ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। এই রায়ে চাকরি হারান প্রায় ২৬ হাজার মানুষ। কারুর চোখে জল, কারুর সামনে অন্ধকার। তবু শীর্ষ আদালতের বার্তা ছিল স্পষ্ট স্বচ্ছতা ভাঙলে শাস্তি অনিবার্য।
অন্যদিকে, প্রাথমিক নিয়োগের মামলা যেন ছিল একেবারে অন্য সুরে বাঁধা। ৩২ হাজার শিক্ষকের মাথায় বছর দুয়েক ধরে ঝুলছিল আশঙ্কার কালো মেঘ। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ে চাকরি বাতিলের ধাক্কায় তছনছ হয়েছিল এত দিনের পরিশ্রম, পরিবারের নিত্যদিনের হিসেব। আর সেই অবস্থায় ডিভিশন বেঞ্চের রায় এল যেন দমবন্ধ অন্ধকারে হঠাৎ উজ্জ্বল প্রদীপের আলো।
বিচারপতিরা বললেন, এখানে যে বেনিয়ম হয়েছে, তা পুরো সিস্টেমের নয়। কয়েকজনের অনিয়মের দায় ৩২ হাজার শিক্ষকের উপর চাপানো যায় না। তাঁরা ৯ বছর ধরে নিখুঁত ভাবে পড়াচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই। তাই আদালত মানবিক দৃষ্টি নিয়েই বলল নির্দোষদের চাকরি যাবে কেন? তাঁদের পরিবার, সন্তান, স্থির জীবনের পাথেয়, সব ধ্বংস হয়ে যাবে। আইন শাস্তি দেবে দোষীকে, কিন্তু নির্দোষকে নয়।
তবু সবাই খুশি নন। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সতর্কবার্তা দিয়েছেন, এই রায়ে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক দুর্নীতি আরও বাড়তে পারে। কিছু তথ্য আদালতে প্রকাশ পেলেও তা গুরুত্ব না পেলে পরবর্তী নিয়োগে বিপদ আরও বাড়বে।
শেষমেশ দুই রায় যেন দুই দর্শন! এসএসসি-তে কঠোর নিরীক্ষা, কঠিন শাস্তি; প্রাইমারিতে নির্দোষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক আদালত। রাজ্যের মানুষ তাই এখনো প্রশ্ন তোলে, দুই রায়ের পথে এই পার্থক্য কি কেবল প্রমাণের ভিত্তিতে, নাকি সময়ের দাবি?
উত্তর যাই হোক, দুই রায়ের ছায়া আর আলো! দু’টিই এখন রাজ্যের নিয়োগ ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে রইল।
