
যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জনপদ ভস্মসাৎ করে ফেলে, আয়তনে সে কতটুকু? হয়তো সামান্য এক স্ফুলিঙ্গ, কিন্তু তার লেলিহান শিখা যখন ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে আমাদের এই প্রাণের মহানগরীকে, তখন সেই প্রশ্নই বারংবার মনে জাগে— কেন এই শহর বারবার জতুগৃহে পরিণত হচ্ছে?
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলির তালিকা এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। গত ২৯ শে এপ্রিল বড়বাজারের ঋতুরাজ হোটেলে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে ১৪টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। এরপর ১৫ ই জুন খিদিরপুর এলাকায় এক বড় অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৭০০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আর ১৫ ই নভেম্বর এজরা স্ট্রিটের ইলেকট্রনিক্স দোকানে আগুন ছড়িয়ে প্রায় ৩০০ দোকানের ক্ষয়-ক্ষতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিপদ কতটা সন্নিকটে।
কাঠগড়ায় বেহাল পরিকাঠামো
শুধুই কি বেহাল অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা? না, এর পিছনে রয়েছে আরও গভীর সমস্যা। আমাদের শহর কলকাতা বহু পুরনো, এর পরিকাঠামো আজকের অত্যাধিক জনসংখ্যার ভার বহনে অক্ষম। ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর পৌঁছানোই দুরূহ, তার উপর যত্রতত্র দাহ্য বস্তুর মজুত এবং বিদ্যুতের জরাজীর্ণ তারের জঙ্গল— এগুলো যেন একেকটি ‘টাইম-বোমা’ হয়ে রয়েছে। প্রতিবার বড়সড় বিপর্যয়ের পর দমকল বিভাগের ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন দেখা দিলেও, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত। দ্রুত পৌঁছাতে না পারা, জলের অপ্রতুলতা বা আধুনিক সরঞ্জামের অভাব— এই ব্যর্থতাগুলির পুনরাবৃত্তি ঘটছে নিরন্তর।
নিরাপত্তা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন
কিন্তু এই তথ্য-নির্ভর কাঠামোগত কারণগুলির বাইরে আরও একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন সামনে আসে—
আজ আমাদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কোথায়? যে শহরে মানুষ স্বপ্ন দেখে, জীবিকা নির্বাহ করে, সেই শহরের প্রতিটি পদে পদে যদি মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে, তবে সেই ভয়মিশ্রিত অনুভূতিকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। এই ঘটনাগুলি শুধু সম্পত্তি বা ব্যবসার ক্ষতি করে না, মানুষের মনে স্থায়ী এক নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। এটি একটি মানবিক বিপর্যয়, যেখানে অসহায় নাগরিক সমাজ কেবলই চেয়ে দেখে তার সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে যেতে।
আমরা সরকার, প্রশাসন বা দমকল বিভাগের দিকে আঙুল তুলতেই পারি, কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের নিজেদের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া চলে না। শহরের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা কি যথেষ্ট সতর্ক? নিজের ঘর, দোকান বা কর্মস্থলে কি অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা মজুত আছে? বৈধ উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করছি তো?
আমাদের বুঝতে হবে, অগ্নি সুরক্ষার প্রথম এবং শেষ ধাপটি কিন্তু আমাদের হাতেই। একটি সমাজ হিসাবে এই বার্তার গুরুত্ব অনুধাবন করা প্রয়োজন। প্রশাসন তার কাজ করুক, কিন্তু তার সাথে আমাদেরও প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতন হতে হবে। ছোটখাটো অসতর্কতাই ডেকে আনে বড় বিপদ। যে শহরকে আমরা ভালোবাসি, তাকে রক্ষার দায়িত্ব কেবল কর্তৃপক্ষের নয়, আমাদের সকলের।
জীবন অমূল্য, আর সেই জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সম্মিলিত সদিচ্ছা এবং সচেতনতা আজ সময়ের দাবি।।
