
বিশ্ব উষ্ণায়ন ও প্রভাব
বিশ্ব উষ্ণায়ন আজ কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়া এক কঠিন বাস্তবতা। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় এবং শিল্প প্রক্রিয়ার ফলে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর গড় পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উষ্ণায়নের ফল সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী ঘন ঘন এবং তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে। উষ্ণ জলবায়ুর ফলে হিমবাহ এবং বরফের স্তূপ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করছে। এর পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, খরা এবং ভারী বৃষ্টিপাতের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলির ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতাও বাড়ছে। বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসছে, যা একদিকে বন্যা ও ভূমিধস সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ব্যাহত করে দীর্ঘস্থায়ী খরার জন্ম দিচ্ছে। এই সবকিছুর মিলিত প্রভাব অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করছে এবং বাস্তুতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করছে।
বাংলার ওপর প্রভাব ও বিপর্যয়ের পরিস্থিতি
সারা বিশ্বের মতো পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলেও উষ্ণায়নের প্রভাব স্পষ্ট। ইন্টার গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (IPCC) ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮৫০-১৯০০ এর তুলনায় ২০১১-২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবীর স্থলভাগের গড় উত্তাপ ১.১°C বেড়েছে। এই বৈশ্বিক চিত্রের চেয়েও উদ্বেগজনক হলো বাংলার পরিস্থিতি: প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে জলস্তর বাড়ছে প্রায় সাত মিলি মিটার।
এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলস্বরূপ সমুদ্রের জলস্তর ধীরে ধীরে বাড়ার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পরিমাণও বহুগুণ বেড়েছে। উপকূলীয় বাংলা, বিশেষ করে সুন্দরবন ও আশপাশের দ্বীপাঞ্চল তাই সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে।
উপকূলবর্তী মানুষগুলির উপর ঘনিয়ে আসছে এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। সমুদ্রের নোনা জল বাঁধ ভেঙে গ্রামে প্রবেশ করছে, ফলে পানীয় জলের উৎস দূষিত হচ্ছে এবং কয়েক হাজার বিঘা চাষের জমি স্থায়ীভাবে লবণাক্ত ও অনাবাদী হয়ে যাচ্ছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের ফলে মানুষ বারবার তাদের বসতভিটা ও জীবিকা হারাচ্ছে। বাস্তুচ্যুত হয়ে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন বহু মানুষ। জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়া এই জনগোষ্ঠীর জন্য জীবনধারণ আজ এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। একদিকে প্রকৃতির রুদ্র রূপ, অন্যদিকে জীবনধারণের ন্যূনতম সুবিধার অভাব—এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হচ্ছে।
উন্নয়ন বনাম অস্তিত্বের লড়াই
আজ উপকূলীয় বাংলার মানুষের সামনে এক কঠিন দ্বন্দ্ব: উন্নয়ন বনাম অস্তিত্বের লড়াই। একদিকে সরকার ও মানুষের উদ্যোগে রাস্তা, ঘরবাড়ি, চাষাবাদ ও পর্যটনের প্রসার চলছে। উন্নয়নের নামে শিল্প স্থাপন, নগরায়ণ এবং দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির দিকে আমরা মনোনিবেশ করছি। অন্যদিকে, বাড়তে থাকা লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং ঘন ঘন দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে।
উন্নয়ন যত এগোচ্ছে, ততই প্রকৃতির উপর চাপ বাড়ছে। নির্বিচারে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে পর্যটন কেন্দ্র বা দুর্বল বাঁধ নির্মাণ আমাদের অস্তিত্বের সংকটকে আরও গভীর করছে। এটি প্রশ্ন তোলে: যে উন্নয়ন পরিবেশকে ধ্বংস করে, তা কি আদৌ টেকসই? স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভের জন্য আমরা কি দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়কে ডেকে আনছি?
তাই, এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে উন্নয়নের সংজ্ঞাকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। উপকূলীয় বাংলার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চাই এমন এক স্থিতিশীল উন্নয়ন মডেল, যা পরিবেশ ও মানুষের অস্তিত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। উপকূল রক্ষায় চাই দৃঢ় বাঁধ, লবণাক্ততা প্রতিরোধী কৃষি এবং ম্যানগ্রোভের পুনঃস্থাপন। উন্নয়ন হোক, তবে তা যেন প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত না করে, বরং সহাবস্থান করে বাংলার মানুষের অস্তিত্বকে নিশ্চিত করে।
