
স্নিগ্ধা চৌধুরী
বাঙালির জীবনে উৎসবের শেষ নেই। কথায় আছে, “বারো মাসে তেরো পার্বণ” এই তেরো পার্বণেরই এক অনন্য, প্রাণের উৎসব নবান্ন।
হেমন্তের ভোরবেলায় যখন কুয়াশার চাদর মাটিকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে, তখন দূরের মাঠে শোনা যায় হালকা খসখস শব্দ। যেন সোনালি ধানগুলো নিজেরাই আনন্দে মাথা নাড়ছে, বলছে, “চলে এলো নবান্ন।” অগ্রহায়ণ মাসের এই দিনটি বাঙালির গ্রামজীবনে শুধু একটা তারিখ নয়, এটা এক অনুভূতি মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক অনন্ত আনন্দের ঢেউ।
ধানের ক্ষেতে তখন সোনালি রোদ পড়ে। বাতাসে মিশে থাকে নতুন ধানের সুগন্ধ। কৃষকের চোখে ঘুম নেই; সারা বছরের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আজ যেন সার্থকতার আলোয় ধরা দেয়। পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার উচ্ছ্বাসে ঘর-আঙিনা মুখর। বউ-ঝিরা উঠোন জাগায় ঝাড়ুছাঁটে, আলপনা আঁকে, আর ঘরের পুরোনো হাঁড়িকুড়ি ধুয়ে-মেজে প্রস্তুত করে নতুন অন্নের স্বাদে ভরিয়ে তুলতে।
কোনও পেতলের থালায় নতুন ধানের দানা নিয়ে মা ঠাকুরঘরের দরজায় দাঁড়ান। ঢাকের মৃদু আওয়াজ, ধুপের ধোঁয়া, আর গৃহদেবতার সামনে সেজে ওঠা মাটির প্রদীপ এসব মিলিয়ে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় আবহ। নতুন অন্নের প্রথম ভোগ দেওয়া হয় লক্ষ্মী-নারায়ণকে। তারপর সেই অন্নের কিছু অংশ আঙিনায় রেখে দেওয়া হয় কাকের জন্য। পুরনো কাকরা যেন গ্রামের মানুষের আত্মীয় তাদেরই মাধ্যমে পূর্বপুরুষরা নাকি নতুন ধানের এই প্রথম স্বাদ পান। গ্রামের আকাশে তখন একসঙ্গে ক’টা কাকের ডাক শোনা যায়, মনে হয় যেন আশীর্বাদের সুরে তারা বলছে, “ফলন হোক ভালো, সংসার হোক সুখে।”
গ্রামবাংলার এই সময়টার সৌন্দর্য আলাদা। ঘরের বউরা একসঙ্গে বসে মাটির হাঁড়িতে দুধ ফুটিয়ে পায়েস বানায়। নতুন চালের গন্ধে ঘর ভরে যায়। কেউ বানায় দুধপুলি, কেউ উদ্ধার করে গুড়ের কলস। শীতের নরম রোদে উঠোনে পিঠে সেঁকার শব্দ শী-শী-শী যেন উৎসবের নিজস্ব সুর। ছেলেমেয়েরা পুকুরধারে দৌড়োদৌড়ি করে, হাতে খড়কুটো, চোখে খুশির ঝিলিক।
এই সময় গ্রামের পথঘাটও বদলে যায়। বাঁশের খুঁটি গেড়ে শুরু হয়ে যায় নবান্নের মেলা বসানো। মেলার দিন সকালে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে, নতুন ধানের সুবাসে ভরা গ্রামের রাস্তায় ভিড় জমে। মেলার মাঠে ঢুকতেই চোখে পড়ে রঙিন কাগজে মোড়া দোকানের সারি। কোথাও বাউল গান বাজছে, কোথাও লালনের সুরে তাল দিচ্ছে পাথরকুঁচি বাঁশি। গ্রামের বৃদ্ধেরা চারদিকে তাকিয়ে বলেন, এই হল আমাদের আসল বাংলা, মাটির গন্ধে ভরা, হৃদয়ের গরমে তোলা।
মেলার এক কোণে পাহাড়সম ভিড়। সেখানে বায়োস্কোপওয়ালা দাঁড়িয়ে; রঙচঙে বাক্সে চোখ লাগালেই দেখা যায় সিনেমার জগৎ। অন্যদিকে নাগরদোলা ঘুরছে, হাওয়া কাঁপিয়ে। ছোটদের হাসির শব্দে আকাশ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আবার আরেক পাশে জারি-সারি আর মুর্শিদির সুরে চায়ের দোকানের সামনে জটলা বাঁধে। গ্রামের মহিলাদের হাতে তৈরি আচার, নকশা করা গামছা, রাসগোল্লার গরম সিরা, সবই এখানে এক অদ্ভুত আনন্দে মিশে থাকে।
সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয়, নবান্নের কোনও ধর্ম নেই, কোনও জাত নেই। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে নতুন ধানের প্রথম স্বাদ ভাগ করে নেন। কারও বাড়িতে পিঠে, কারও বাড়িতে পায়েস কিন্তু আনন্দটা সবারই এক। যেন নতুন ধান শুধু মাঠে ওঠে না, মানুষের হৃদয়ের ভেতরেও ওঠে। সম্প্রীতির এই ছবি যতই দেখি, মনে হয় কবি জীবনানন্দ দাশের কথাটি সত্য,
“কাক হয়ে ভোরে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে এই নবান্নের দেশে।”
বাংলার মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান কিংবা নদিয়ার অগ্রদ্বীপ যেখানেই নবান্ন পালিত হোক না কেন, তার রং একই। পাকা ধানের হাসি, মানুষের মুখের উজ্জ্বলতা, আর মাটির নরম স্পর্শ, এসব মিলে নবান্নকে বানায় বাংলার আত্মা।
আজকের দিনে শহুরে ব্যস্ততায় অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও নবান্ন তার আলো এখনো জ্বালিয়ে রেখেছে। কারণ নবান্ন কেবল খাবারের উৎসব নয়; এটা বাঙালির জন্মভূমির সঙ্গে, মাটির সঙ্গে, নিজের শিকড়ের সঙ্গে ফিরে দেখা। নতুন ধানের গন্ধে ভেজা এই উৎসব তাই বারবার মনে করিয়ে দেয় বাঙালির সত্যিকারের ঘর মাটির কাছেই, ধানের ক্ষেতে, গ্রামের পথের ধুলোয়।
নবান্ন বাঙালির আশা, বাঙালির ভবিষ্যৎ, বাঙালির গভীরতম ভালোবাসা, যতদিন বাংলার মাঠে সোনালি ধান দুলবে, ততদিন এই উৎসবের আলো কোনওদিন নিভে যাবে না।
