
বর্তমান সময়ে সিন্থেটিক মিডিয়ার উত্থান বৈশ্বিক তথ্য পরিমণ্ডলে এক নতুন ও গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) দ্বারা চালিত এই প্রযুক্তি, বিশেষত ডিপফেক (Deepfake) ভিডিও এবং অডিও, এখন এতটাই বাস্তবসম্মত যে এটি প্রকৃত সত্যকে মিথ্যা দ্বারা প্রতিস্থাপন করার ক্ষমতা রাখে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, ডিপফেক ভিডিওগুলি প্রায় ৭০% ক্ষেত্রেই মানুষের পক্ষে সনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটি শুধু বিনোদন বা জালিয়াতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার ওপরও পড়তে শুরু করেছে।
ডিপফেকের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ
ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারের প্রধান ক্ষেত্রগুলি হলো:
- রাজনৈতিক অস্থিরতা: নির্বাচনকালীন সময়ে বিরোধী নেতা-নেত্রীদের ভুয়ো বিবৃতি বা বিতর্কিত দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। এটি ভোটারদের বিভ্রান্ত করে এবং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত ডিপফেক কন্টেন্টের ৯৬% এরও বেশি অ-সম্মতিক্রমে তৈরি হয়েছে।
- আর্থিক জালিয়াতি: AI-চালিত ভয়েস ক্লোনিং ব্যবহার করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে বহু মিলিয়ন ডলারের আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়েস ডিপফেক বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল সাইবার হুমকিগুলোর মধ্যে একটি।
- ব্যক্তিগত মানহানি ও হয়রানি: ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি আপত্তিকর বা মানহানিকর ভিডিও ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ, বিশেষত মহিলাদের, টার্গেট করা হচ্ছে। এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সুরক্ষার জন্য মারাত্মক হুমকি।
সত্যের সুরক্ষা:
প্রযুক্তি ও নীতির সমন্বয়এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি এবং নীতির সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক কৌশল (Multi-pronged Strategy) প্রয়োজন।
- শনাক্তকরণ প্রযুক্তি: ডিপফেক শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি হচ্ছে, যেমন—AI নির্ভর ওয়াটারমার্কিং এবং মেটাডেটা বিশ্লেষণ। কিন্তু ডিপফেক তৈরির প্রযুক্তিও সমান দ্রুত গতিতে উন্নত হচ্ছে, ফলে এটি একটি অবিরত প্রতিযোগিতা।
- আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো: ইউরোপীয় ইউনিয়নের AI আইন (AI Act) বা অন্যান্য দেশে ডিপফেক কনটেন্ট তৈরির বিষয়ে কঠোর নিয়মাবলী প্রণয়ন করা হচ্ছে। ভারতেও তথ্যপ্রযুক্তি আইন এবং অন্যান্য বিধিনিষেধকে এই নতুন সংকটের মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন।
- প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা: সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভিডিও হোস্টিং প্ল্যাটফর্মগুলিকে কন্টেন্ট যাচাই (Fact-checking) এবং দ্রুত অপসারণের জন্য তাদের নিজস্ব অ্যালগরিদম ও জনবলকে আরও উন্নত করতে হবে।
আপনার হাতেই প্রতিরোধের চাবিকাঠি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা। প্রযুক্তি ও আইন তার কাজ করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের বিচার-বুদ্ধিই হলো সত্যের শেষ রক্ষাকবচ। আমরা যেন ভুয়ো তথ্যের শিকার না হই, সেই দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।
- উৎস যাচাই করুন: কোনো সন্দেহজনক ভিডিও বা খবরের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে বিশ্বাস বা শেয়ার করবেন না। দেখুন, ভিডিওটি কোনো নির্ভরযোগ্য ও মূলধারার সংবাদমাধ্যম দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে কি না।
- বিবেচনামূলক হন: ভিডিওতে অস্বাভাবিক চোখের নড়াচড়া, মুখের অস্বাভাবিকতা, বা অসঙ্গতিপূর্ণ আলোর ব্যবহার লক্ষ্য করুন। প্রায়শই ডিপফেক ভিডিওতে এই ধরনের খুঁত থেকে যায়।
- থামুন এবং চিন্তা করুন: আবেগপ্রবণ বা চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী কোনো কন্টেন্ট দেখার পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে এক মুহূর্ত থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, “এর সত্যতা কতটুকু?”
ডিপফেক প্রযুক্তির এই যুগে, ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy) আর কেবল একটি দক্ষতা নয়, এটি একটি নাগরিক কর্তব্য। সত্যকে আবিষ্কার করার এবং মিথ্যাকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা আমাদের সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা অনুশীলন করার মাধ্যমেই আমরা ভুয়ো ভিডিওর এই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে আলোর দিশা দেখাতে পারি।
