
শীতের হিমেল ছোঁয়া পেয়েই যেন বদলে যায় জলপাইগুড়ির সকাল-দুপুর-সাঁঝ। আকাশের নীল ক্যানভাসে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে ওঠে ডানার শব্দ, আর জলাশয়ের বুকে প্রতিফলিত হয় রঙিন অতিথিদের খেলা। ডিসেম্বরের শুরুতেই জলপাইগুড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পরিযায়ী পাখি যাদের আগমনেই প্রাণ ফিরে পায় শহরের উপকণ্ঠ।
জলপাইগুড়ি শহর থেকে একটু দূরের ভাটাখানা ও শোভাবাড়ি এলাকা বহু বছর আগেও ছিল ইটভাটায় ভরা। আজ সেসব ভাটা পরিত্যক্ত, আর সেই পরিত্যক্ত ইটভাটার বিশাল গর্তেই জল জমে তৈরি হয়েছে নতুন জলাভূমি। গত কয়েক বছর ধরে এই জলাশয়গুলোই শীতের মরসুমে পরিণত হয়েছে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে। শুধু এখানেই নয় গজলডোবা আর ডুয়ার্সের বিভিন্ন জলাশয়েও এখন রোজ ভিড় জমছে পাখিপ্রেমীদের।
এবারের তালিকায় রয়েছে চখাচখি, বাঁলিহাস, নর্দান পিনটেল, কমন টিল, নর্দার্ন ল্যাপউইং, হ্যান হেরিয়ার, কমন মুরগন সহ আরও বেশ কয়েকটি প্রজাতি। এদের কেউ এসেছে দেশেরই কাশ্মীর উপত্যকা থেকে, কেউ আবার পার করেছে তিব্বতের বিস্তীর্ণ তুন্দ্রা, শ্রীলঙ্কার উপকূল, কিংবা বহু দূরের ইউরোপ, ফিনল্যান্ড বা সাইবেরিয়া। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসে জমায়েত হয়েছে জলপাইগুড়ির শান্ত জলাধারগুলিতে।
পরিবেশপ্রেমীদের মতে, কয়েক বছর আগেও সংখ্যাটা ছিল আরও বেশি। কিন্তু পরিবেশ দূষণ, জলাভূমি সঙ্কোচন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে ধীরে ধীরে কমে এসেছে পরিযায়ী পাখিদের আগমন। তবুও এবারের সংখ্যা বেশ লক্ষণীয় যা দেখে আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জানান, সকালে ঘর থেকে বেরোতেই দূর দূরান্তের অতিথিদের সুরেলা ডাকে মন ভরে যায়। অনেকেই ক্যামেরা হাতে জলাশয়ের ধার ঘেঁষে ঘুরছেন, বন্দী করছেন প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য।
এলাকার মানুষ যেমন খুশি, তেমনই সতর্কও। পাখিদের বাসস্থান রক্ষায় স্থানীয়দের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেউ যাতে পাখিদের বিরক্ত না করে, সেজন্য সচেতনতা প্রচারও চলছে। কারণ, এই অতিথিদের উপস্থিতিই আসলে এই অঞ্চলের পরিবেশগত সুস্থতার জানান দেয়।
জলপাইগুড়ির শীত এখন যেন অন্যরকম, ডানার শব্দে, জলের ঢেউয়ে, আর রঙিন অতিথিদের কোলাহলে জমে উঠেছে প্রকৃতি। কথায় আছে – হাজার হোক, অতিথি তো দেবো ভব।
