
ভারতে বিনোদনের জগতে ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মগুলি এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, ডিজনি+ হটস্টারের মতো জায়ান্টরা দর্শকদের হাতে তুলে দিয়েছে এক বিশাল বৈচিত্র্যময় কন্টেন্টের সম্ভার। চিরাচরিত মিডিয়ার বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হয়ে, এই প্ল্যাটফর্মগুলি কন্টেন্ট নির্মাতাদের এমন এক সৃজনশীল স্বাধীনতা দিয়েছে, যেখানে তারা সাহসী, পরীক্ষামূলক এবং ভিন্নধর্মী আখ্যান তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।
সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত
ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো গ্লোবাল মঞ্চ তৈরি করেছে। নির্মাতারা এখন বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে তাদের কাজ পৌঁছে দিতে পারছেন। এর ফলে কমেডি, থ্রিলার, সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ—সব ধরনের বিষয়ে গভীর ও বিস্তারিত কাজ তৈরি হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলি গতানুগতিক নিয়মনীতির সমালোচনা করে নতুন গল্প বলার একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করেছে। এটি নিঃসন্দেহে শিল্পীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ও নতুন সেন্সরশিপ
তবে, এই লাগামহীন স্বাধীনতার উল্টো দিকেই লুকিয়ে আছে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। কিছু বিষয়বস্তু নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি বিতর্ক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের উদ্বেগের কারণে পরিস্থিতি মোড় নিয়েছে অন্যদিকে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বা দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সহিংসতা ও অশ্লীলতা প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে বহুবার। এই প্রেক্ষাপটে, সরকার ‘তথ্যপ্রযুক্তি (মধ্যস্থতাকারী নির্দেশিকা এবং ডিজিটাল মিডিয়া নীতিসংহিতা) বিধি, ২০২১’-এর মাধ্যমে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনেছে।
এই সরকারি হস্তক্ষেপ, প্ল্যাটফর্মগুলির নিজস্ব স্ব-নিয়ন্ত্রণ কোড এবং সংবেদনশীল কন্টেন্টের জন্য সরাসরি ব্লক করার ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে এক নতুন ধরনের ‘সেন্সরশিপ’ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। সৃজনশীল স্বাধীনতা যেখানে নির্মাতাদের অধিকার, সেখানে ‘ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রতি সম্মান’ বজায় রাখার প্রশ্নটি এখন প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য এক আইনি বাধ্যবাধকতা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা বনাম স্বাধীনতা
আসলে এটি সৃজনশীল স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে একটি জটিল টানাপোড়েন। সৃজনশীলতার নামে অশ্লীলতা বা সংবেদনশীলতার অপব্যবহার হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এই দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত লেখক, পরিচালক, প্রযোজক এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলিকেও সমানভাবে নিতে হবে।
বিনোদন মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু তার বাণিজ্যিক দিক দেখতে গিয়ে সামাজিক দিকের প্রতি অসচেতনতা কাম্য নয়। যদি নির্মাতারা এবং প্ল্যাটফর্মগুলি দায়িত্বশীল না হয়, তবে সরকার বা সমাজের দিক থেকে আরও কঠোর নতুন সেন্সরশিপের প্রয়োজন দেখা দেবে। সৃজনশীল স্বাধীনতা অবশ্যই অপরিহার্য, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই প্রহসনে পরিণত না হয়। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলির এখন উচিত আইনি বাধ্যবাধকতা এবং দর্শক চাহিদার মধ্যে এক সংবেদনশীল ভারসাম্য বজায় রাখা।
