
রমেন্দ্র গোস্বামী
ত্রিপুরার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ঊনকোটি শুধু একটি ধর্মস্থান নয়, এটি ইতিহাস, লোককথা, শিল্পকলা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। উত্তর ত্রিপুরা জেলার কৈলাশহর মহকুমার অদূরে পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা এই স্থানটি রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন ও রহস্যময় তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। “ঊনকোটি” শব্দের অর্থ এক কোটি থেকে এক কম—৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৯৯। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ভগবান শিবের সঙ্গে এক কোটি দেব-দেবী কাশীর উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। পথে শিব এখানে রাত্রিযাপন করেন এবং নির্দেশ দেন, সূর্যোদয়ের আগে যাঁরা উঠতে পারবেন না, তাঁরা এখানেই থেকে যাবেন। পরদিন এক দেবতা ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে থাকায় তাঁরা পাথরে পরিণত হন—এভাবেই ঊনকোটির সৃষ্টি বলে বিশ্বাস।ঊনকোটির প্রধান আকর্ষণ ‘ঊনকোটিশ্বর কালভৈরব’—পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশালাকার শিবমূর্তি। প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার এই মুখাবয়ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ রক-কাট শিবমূর্তির মধ্যে গণ্য। শিবের কপালে তৃতীয় নয়ন, কানে সুবৃহৎ কুণ্ডল, মাথার জটায় গঙ্গা ও চারপাশে দেব-দেবীর প্রতিকৃতি দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। শিবমূর্তির পাশে রয়েছে দেবী দুর্গা, পার্বতী, গণেশ, নন্দী ও অন্যান্য পৌরাণিক চরিত্রের অসংখ্য শিলাখোদাই মূর্তি, যা স্থানটিকে এক বিশাল খোলা আকাশের শিল্পশালায় পরিণত করেছে।প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ঊনকোটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিলাখোদাই শিল্পের নির্মাণকাল অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়। পাহাড় কেটে এত সূক্ষ্ম, বিশাল ও ভাবগম্ভীর মূর্তি নির্মাণ সেই সময়কার শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতা ও কল্পনাশক্তির পরিচয় বহন করে। এই শিল্পকর্মে শৈব ধর্মের প্রভাব স্পষ্ট হলেও লোকশিল্প ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির ছাপও লক্ষ্য করা যায়।ধর্মীয় উৎসবের সময় ঊনকোটির রূপ আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। প্রতি বছর শিবচতুর্দশী উপলক্ষে এখানে বিরাট মেলা বসে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকেও হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটক এই তীর্থস্থানে সমবেত হন। পূজা, আরতি ও ধর্মীয় আচার -অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঊনকোটি তখন এক আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও ঊনকোটি অনন্য। পাহাড়, ঝর্ণা, ঘন সবুজ অরণ্য ও নির্জন পরিবেশ পর্যটকদের মনে এক গভীর প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়। রাজ্য সরকার ও পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে রাস্তা, সিঁড়ি, আলোকসজ্জা ও পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়ন হওয়ায় বর্তমানে এখানে যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে। ধর্ম, ইতিহাস ও প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে ঊনকোটি আজ ত্রিপুরার গর্ব এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে নিয়েছে।
