
একটি মেগা ইভেন্ট বা বড় আয়োজন মানেই কেবল আলোকসজ্জা আর জাঁকজমক নয়। এর পেছনে প্রয়োজন হয় সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব। কিন্তু আমাদের রাজ্যে যখনই বড় কোনো আয়োজন হয়, তখনই এক কদর্য অব্যবস্থাপনা প্রকট হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির সফরকে কেন্দ্র করে যে নক্কারজনক পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা কেবল বিশৃঙ্খলা নয়; বরং তা আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে।একটি সফল ইভেন্ট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে ত্রুটিহীন বাস্তবায়ন। কিন্তু মেসির সফরের ক্ষেত্রে দেখা গেল ঠিক উল্টো চিত্র। আয়োজকদের মাঝে ছিল প্রচারের সস্তা কাঙালপনা, আর প্রশাসনের মাঝে ছিল চরম উদাসীনতা। যখন বিশ্বমানের একজন তারকা কোনো রাজ্যে আসেন, তখন প্রোটোকল অনুযায়ী যে ধরনের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়, তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে খোদ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদেরই দেখা গেল সেলফি তুলতে ব্যস্ত থাকতে। এটি কি পেশাদারিত্ব নাকি নির্লজ্জ অপেশাদারিত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ?
এই ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই আয়োজক সংস্থা এড়াতে পারে না। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নাম করে তারা যে অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা ছিল না, ছিল না জরুরি পরিস্থিতির জন্য কোনো বিকল্প পথ। শুধু সস্তা আড়ম্বর দিয়ে যে বিশ্বমানের ইভেন্ট হয় না, আয়োজকদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতা তা আবারও প্রমাণ করল। তারা যেন ভুলে গিয়েছিল যে, তারা কোনো পাড়ার ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে না, বরং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদকে আতিথেয়তা দিচ্ছে।এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও কম দায়ী নয়। প্রায়ই দেখা যায়, এ ধরনের বড় আয়োজনে পেশাদার সংস্থাকে সরিয়ে দিয়ে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ বা পছন্দের অদক্ষ গোষ্ঠীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন বিশৃঙ্খলা অবধারিত। প্রশাসনের শীর্ষ মহলের তদারকি যেখানে কঠোর হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তারা দলবাজি আর তোষামোদিতেই মগ্ন ছিল বেশি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে—বিশৃঙ্খলা পৌঁছাল চরমে, আর বিপন্ন হলেন খোদ বিশ্বতারকা।হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটে সাধারণ মানুষ যখন “ মেসি ম্যাজিক “ দেখতে পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলেন তখন আয়োজক, প্রশাসন ও সর্বোপরি সরকার কে জনতার রোষানলে পড়তে হবে এটা তো স্বাভাবিক বিষয়।
আমাদের রাজ্যের মন্ত্রী ও তারকা নিমন্ত্রিত ছিলেন সেটা ঠিক কিন্তু তিনি মাঠে প্রবেশের পুরো সময় তাদের তাঁকে ঘিরে থাকা, সেলফি তোলা কখনোই কাম্য ছিল না।আমাদের বাকি রাজ্যে এরকম চরম অব্যবস্থা তো দেখা যায় নি। তার মানে প্রশ্ন তো উঠবেই সরকারে ওপর আর প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে ছিল চরম লজ্জাজনক। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা যাদের কাজ, তারা যখন নিজেরাই বিশৃঙ্খলার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো বড় কোনো আন্তর্জাতিক ইভেন্ট সামলাতে এখনও কতটা অপাংক্তেয়।
শুধু বড় বড় হোর্ডিং আর গেট বানালেই ইভেন্ট সফল হয় না। তার জন্য দরকার স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও দৃঢ় প্রশাসনিক সদিচ্ছা। লিওনেল মেসির সফরে যে কেলেঙ্কারি হলো, তা থেকে যদি আমরা শিক্ষা না নিই, তবে আগামী দিনে বিশ্বদরবারে আমরা আবারও হাসির পাত্র হয়েই থাকব। সময় এসেছে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে এই ঘুণ ধরে যাওয়া ব্যবস্থার সংস্কার করার।।
