
ভারতে স্থূলতা বা ওবেসিটি চুপিচুপি মহামারির আকার নিচ্ছে। গত দুই দশকে দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে ফাইভ (NFHS-5, 2019–21) অনুযায়ী, দেশের প্রায় চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন স্থূল। রাজ্যভেদে হার ৮ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পরিবর্তিত। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে পুরুষ ও মহিলাদের উভয়ই এতে আক্রান্ত।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চের (ICMR) ২০২৩ সালের সমীক্ষা জানাচ্ছে, দেশের ৩৫ কোটি প্রাপ্তবয়স্কের পেটের স্থূলতা রয়েছে, ২৫ কোটি সাধারণ স্থূল এবং ২১ কোটি উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ে বসবাস করছে। গত ১৫ বছরে স্থূল প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর সংখ্যা দ্বিগুণ এবং ৩০ বছরে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে স্থূল শিশুর সংখ্যা ১ কোটি ৪৪ লক্ষ, যা চীনের পরে বিশ্বের দ্বিতীয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ওজন শুধুমাত্র বাহ্যিক সমস্যা নয়, বরং টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে পেটের চর্বি বা কেন্দ্রীয় স্থূলতা (Central/Visceral Obesity) নিতম্ব বা উরুর চর্বির তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক। শিশুদের ক্ষেত্রে স্থূলতা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। জয়েন্টে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মানসিক অবসাদ এবং আত্মসম্মান হানির মতো সমস্যা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও প্রভাব রাখতে পারে।
মূল সমস্যা হলো জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাস। শহরাঞ্চলে অফিস বা অফিস টাইপ কাজ, দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকা, শারীরিক কার্যকলাপের অভাব ও প্রক্রিয়াজাত বা ফাস্ট ফুডের অতিরিক্ত ব্যবহার স্থূলতা বাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানাচ্ছে, ভারতের অর্ধেক মানুষই পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করেন না। ৫৫ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে সক্ষম নন, এবং প্রায় ৪০ শতাংশের খাদ্য পুষ্টিহীন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এই সমস্যা আরও বাড়িয়েছে।
চরম স্থূলতার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডায়েট বা ব্যায়াম কার্যকর নয়। ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি, বিশেষ করে রোবোটিক পদ্ধতি যেমন স্লিভ গ্যাস্ট্রেক্টমি ও গ্যাস্ট্রিক বাইপাস, ওজন কমাতে এবং ডায়াবেটিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ARMMS-T2D স্টাডি অনুযায়ী, ১২ বছর পরও রোগীরা গড়ে ২০ শতাংশ ওজন কমাতে সক্ষম হয়েছেন। পেশিশক্তি বজায় থাকে, শক্তি বৃদ্ধি পায়, এবং হৃদরোগ বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)–এর মতো সমস্যায় উন্নতি দেখা যায়।
সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগও অত্যন্ত জরুরি। স্থূলতা শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপরও চাপ ফেলে। তাই প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা দুটোই সমন্বিতভাবে চালাতে হবে। স্কুল ও কমিউনিটিতে শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলা, অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ, এবং শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ এলাকায়ও মহিলা ও পুরুষদের মধ্যে স্থূলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই স্থানীয় জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের সুযোগ বিবেচনা করে সচেতনতা ও হস্তক্ষেপ চালানো প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, স্থূলতা দ্রুত বাড়ছে এবং এটি দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। চিকিৎসা, জীবনধারার পরিবর্তন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক কার্যকলাপের সমন্বয়ই একমাত্র পথ। এখনই পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে বিপুল স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।
