
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—রাস্তায় নেমে নিজের হকের জন্য লড়াই লড়া কি নাগরিকের অধিকার, নাকি রাষ্ট্রের চোখে তা দণ্ডনীয় অপরাধ? আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞা গত কয়েক বছরে ভোজবাজির মতো বদলে গেছে। যেখানে সরকার বা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা ছিল সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ, আজ সেখানে প্রতিবাদের স্বর শোনা গেলেই পুলিশের বুট আর প্রিজন ভ্যান তেড়ে আসে। মনে হচ্ছে, রাষ্ট্র এখন এক নতুন অভিধান লিখছে, যেখানে ‘অধিকার’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বসানো হয়েছে ‘অরাজকতা’।
ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার এবং বাক-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। এই অধিকার কোনো দয়া বা দান নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানে চিত্রটা উল্টো। প্রতিবাদ করলেই জুটছে মামলা, ধরপাকড় আর রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শায়েস্তা’ করার হুমকি। রাষ্ট্র ভুলে যাচ্ছে যে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবাদের মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া তার দায়িত্ব ছিল। অথচ সেই রাষ্ট্রই আজ প্রতিবাদের টুঁটি চেপে ধরছে।মানবাধিকারের মূল কথা হলো মুক্ত চিন্তা ও শোষণমুক্ত সমাজ। যখনই কোনো জুলুম বা শোষণের বিরুদ্ধে মানুষ সরব হয়, তখনই ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষেরা অস্থির হয়ে ওঠে। সাধারণ নাগরিকের শারীরিক ও মানসিক অখণ্ডতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের ধর্ম, কিন্তু আজ রাষ্ট্র নিজেই যেন এক প্রবল প্রতিপক্ষ। জনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যে ‘যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ’ আরোপ করা হয়, তা এখন প্রতিবাদ দমনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের নীতি বা কোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেই সেটাকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই ‘রাষ্ট্রের নতুন সংজ্ঞা’ আসলে এক ভয়ঙ্কর স্বৈরাচারী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত বা ডিসেন্ট (Dissent) হলো অক্সিজেন। যখনই সেই অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখনই গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে। রাষ্ট্র এখন প্রতিবাদকে নাগরিক অধিকার হিসেবে না দেখে ‘বিশৃঙ্খলা’ বা ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখছে। মিছিলের মুখগুলো তাদের কাছে কোনো সংক্ষুব্ধ মানুষ নয়, বরং এক একটা ‘টার্গেট’। আধুনিক সভ্য সমাজে এই প্রবণতা শুধু অগণতান্ত্রিক নয়, বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সবশেষে বলা প্রয়োজন, প্রতিবাদ অপরাধ নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্রের জেগে থাকার প্রমাণ। নাগরিকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া যায়, কিন্তু তাদের ক্ষোভকে চিরকাল চেপে রাখা যায় না। রাষ্ট্র যদি নিজেকে শুধু শাসক হিসেবে দেখে এবং জনগণকে প্রজা মনে করে, তবে সেই গণতন্ত্রের কঙ্কালসার চেহারাটাই বেরিয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সংজ্ঞা হওয়া উচিত ছিল সেবা এবং সুরক্ষা, কিন্তু তা যদি দমন-পীড়নে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে—আমরা এক অন্ধকার সময়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছি। প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলো যখন কারাগারে বন্দি হয়, তখন আসলে সেই রাষ্ট্রের বিবেকই বন্দি হয়ে যায়।আর সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন গণতন্ত্র ও মানুষের মৌলিক অধিকারকে খুন করলে সেই রাষ্ট্রের ভাঙন অনিবার্য।।
