
একটি শিশুর জন্মের পর যখন তার নরম হাতের তালুতে পৃথিবীর অকৃত্রিম স্পর্শ পাওয়ার কথা, ঠিক তখনই তার কপালে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার স্টিকার। আধুনিক নগরায়নের এই যুগে ‘শৈশব’ শব্দটা আজ কেবল অভিধানেই সীমাবদ্ধ। শহরের ধূসর কংক্রিটের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আমাদের শিশুরা আজ এক অসম লড়াইয়ের সৈনিক। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো, এই লড়াই কি তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য, নাকি অভিভাবকদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার বোঝা বইবার জন্য?আকাঙ্ক্ষার যাঁতাকল ও যান্ত্রিক রুটিনে আজ বিঘ্নিত শৈশব।
আজকাল একটি শিশু পৃথিবীতে আসার আগেই তার শিক্ষাজীবনের নীল নকশা তৈরি হয়ে যায়। কোন নামী স্কুল, কোন নামজাদা বোর্ড, কিংবা কোন মাধ্যমে পড়লে সমাজের তথাকথিত ‘এলিট’ শ্রেণিতে জায়গা পাওয়া যাবে—তা নিয়ে চলে অভিভাবকদের চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু ট্র্যাজেডি শুরু হয় তারপর। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘এক্সট্রা কারিকুলাম’-এর পাহাড়। গান, নাচ, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, ক্যারাটে, সাঁতার—তালিকাটি দীর্ঘ। এমনকি সুযোগ থাকলে হয়তো মা-বাবারা তাদের এভারেস্ট জয় করতেও পাঠিয়ে দিতেন।বিপত্তিটা এখানেই যে, এই প্রতিটি বিষয় এখন আর কেবল সৃজনশীলতা চর্চার মাধ্যম নয়, বরং এগুলোও একেকটি ‘পরীক্ষা’। স্কুলের পরীক্ষার পাশাপাশি এই প্রতিটি বিষয়ের গ্রেড আর সার্টিফিকেটের পেছনে ছুটতে ছুটতে শিশুটি ভুলে যায় প্রাণখুলে হাসতে। তার কাছে ‘শৈশব’ মানেই সকাল থেকে রাত অবধি ঘড়ি ধরে এক কোচিং থেকে অন্য কোচিংয়ে ছুটে চলা। এই যান্ত্রিক রুটিন তাদের শৈশবের সারল্যকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে শৈশব মানে ছিল গায়ে কাদা মেখে বাড়ি ফেরা, বন্ধুদের সাথে তুচ্ছ কারণে মারপিট আর পরক্ষণেই মিলে যাওয়া। বিকেলে এক চিলতে মাঠে গোল্লাছুট বা কানামাছি খেলে জিতলে সারা পাড়া জুড়ে যে আনন্দ মিছিল হতো, তার তুলনা কোনো এসি রুমের ভিডিও গেমে নেই। সেই পুতুল খেলা বা রান্নাবাটির জগত আজ বিলুপ্তপ্রায়।মাঠের সেই প্রাণবন্ত জায়গা আজ দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোনের নীল আলো, নেটফ্লিক্স কিংবা অ্যামাজন প্রাইম। কৃত্রিম এই বিনোদনে অভ্যস্ত শিশুটি একা থাকতে শিখছে, কিন্তু সমাজবদ্ধ হতে শিখছে না। মা-বাবার অতি-সতর্কতা আর উচ্চাশা তাদের এতটাই চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করেছে যে, প্রকৃতির সাথে তাদের নাড়ির টান ছিঁড়ে গেছে। তারা এখন বৃষ্টির শব্দ শোনার চেয়ে ইউটিউবে বৃষ্টির ভিডিও দেখতে বেশি অভ্যস্ত।
তত্ত্বগতভাবে আধুনিক শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ। কিন্তু বর্তমানে তা কেবল মুখস্থ বিদ্যা আর জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। যখন একটি শিশুর বিকাশের জন্য অবাধ কল্পনা আর খেলার প্রয়োজন, তখন তাকে গাণিতিক সূত্র আর কঠিন বানানের জালে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক ও মানসিক বিকাশ।এই যান্ত্রিকতার প্রভাবে শিশুরা ক্রমশ আবেগহীন হয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে সহমর্মিতা বা ত্যাগের চেয়ে ‘স্বার্থপরতা’ বেশি প্রকট হচ্ছে। কারণ তারা শিখছে কেবল নিজেকে সেরা প্রমাণ করতে হবে, পাশে থাকা বন্ধুটিকে হারিয়ে দিতে হবে। এই যে ‘একলা চলো’ নীতি, তা ভবিষ্যতে তাদের মানসিকভাবে একা ও বিষণ্ণ করে তুলছে। তারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে চাইছে না, কারণ সমাজ এবং পরিবার তাদের কেবল ‘পাওয়া’র হিসেব শিখিয়েছে, ‘দেওয়া’র আনন্দ নয়।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এক বিশাল প্রতিযোগিতার বাজারে পরিণত হয়েছে। স্কুলগুলো এখন কেবল মানুষ গড়ার কারিগর নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। ফলে অভিভাবকরাও এক অদ্ভুত হীনমন্যতায় ভোগেন—যদি আমার সন্তান অন্য সবার চেয়ে বেশি কিছু না শেখে, তবে সে পিছিয়ে পড়বে। এই ‘পিছিয়ে পড়ার ভয়’ থেকে জন্ম নেয় শিশুকে অতি-ব্যস্ত রাখার প্রবণতা। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, শৈশবের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে অবসরে, যখন একটি শিশু নিজের মনের সাথে কথা বলে, আকাশ দেখে কিংবা স্রেফ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটে। সেই অমূল্য অবসরটুকুই আজ কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে—আপনি কি আপনার সন্তানকে একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়তে চান, নাকি একটি দক্ষ রোবট হিসেবে? আপনার সন্তান কোনো প্রতিযোগিতার ঘোড়া নয়। তার শৈশব আপনার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের মাধ্যম হতে পারে না। শিশুকে জিপিএ-৫ এর নেশা না করিয়ে সামাজিক মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া জরুরি। তাকে মাটির স্পর্শ পেতে দিন, কাদামাটি মেখে বড় হতে দিন, বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খেতে শেখান।শিক্ষা মানে কেবল বইয়ের পাতা নয়, শিক্ষা মানে জীবনকে অনুভব করা। অতিরিক্ত শাসনের শিকল ভেঙে তাকে একটু নিঃশ্বাস নিতে দিন। মনে রাখবেন, একটি সুঠাম ডিগ্রিধারী যান্ত্রিক মানুষের চেয়ে একটি সংবেদনশীল ও সুস্থ মনের মানুষ পৃথিবীর জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন। আসুন, শিশুদের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে তাদের হাতে খেলার বল তুলে দিই, তাদের পিঠ থেকে বইয়ের বোঝা কমিয়ে একটু খোলা আকাশ দেখার সুযোগ করে দিই। শৈশব বাঁচলে, তবেই বাঁচবে আগামীর মানবিক পৃথিবী।
