
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলা নানাবিধ সহিংসতা ও অস্থিরতা নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভারতের বর্তমান সরকার, যারা সাধারণত নিজেদের হিন্দু স্বার্থের ‘রক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাদের এই আপাত ‘নিস্তব্ধতা’ বা ‘ধীরে চলো’ নীতি অনেককেই বিস্মিত করেছে। প্রশ্ন উঠছে—তবে কি সীমান্তের ওপারের হিন্দুরা দিল্লির কাছে কেবলই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের দাবার ঘুঁটি?
অনেকের ধারণা, ভারতের অভ্যন্তরে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত থাকলেও বাংলাদেশের হিন্দুদের বিষয়টি সরাসরি কোনো নির্বাচনী সুবিধা দেয় না। কিন্তু বিষয়টি কি কেবলই ভোটব্যাঙ্কের? গভীরে তাকালে দেখা যায়, এখানে কাজ করছে জটিল কিছু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ।
কূটনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থ প্রথমত, বাংলাদেশ ভারতের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম প্রধান কৌশলগত সহযোগী। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা এবং ট্রানজিট সুবিধার জন্য ঢাকার স্থিতিশীলতা দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর অত্যাচারের ইস্যুতে ভারত যদি খুব বেশি সোচ্চার হয় বা কড়া অবস্থান নেয়, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ভারত-বিরোধিতা’ মাথাচারা দিয়ে উঠতে পারে। এতে বাংলাদেশে কট্টরপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
সার্বভৌমত্ব ও হস্তক্ষেপের ভয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। ভারত যদি সরাসরি বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতন নিয়ে অতি-সক্রিয়তা দেখায়, তবে তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো হবু সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে পর্দার আড়ালে আলোচনা (Quiet Diplomacy) চালানোই সম্ভবত দিল্লির বর্তমান অগ্রাধিকার। তারা চায় না এমন কোনো মন্তব্য করতে যা ঢাকাকে দিল্লির থেকে দূরে সরিয়ে বেইজিং বা ইসলামাবাদের দিকে ঠেলে দেয়।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে বিতর্ক রয়েছে, বাংলাদেশের হিন্দু ইস্যু তাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ভারত যদি ওপারের হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের কথা খুব বেশি প্রচার করে, তবে দেশে অনুপ্রবেশ বা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনা রাখে।
পরিশেষে, ভারতের এই নীরবতা বা মৃদু প্রতিক্রিয়াকে ‘নিস্পৃহতা’ না বলে ‘কৌশলগত সতর্কতা’ বলা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দিয়ে একটি মানবিক সংকটকে দীর্ঘক্ষণ ঢেকে রাখা যায় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর পদ্ধতিগত আক্রমণ যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা ভারতের নিজস্ব গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। দিল্লিকে এখন এমন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে যাতে বন্ধুত্বের অমর্যাদা না করে মানবিক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়।
