
আশঙ্কাই সত্যি হলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন মসনদে বসার পর থেকেই যে কঠোর অভিবাসন নীতির পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, তার প্রথম আঘাত আছড়ে পড়ল ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের ওপর। সাম্প্রতিক ঘোষণায় H-1B এবং H-4 ভিসার ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া যেভাবে হঠাৎ বাতিল বা দীর্ঘ মেয়াদে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে কয়েক দশকের মধ্যে সবথেকে বড় অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন লক্ষ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয়। ছুটির অবসরে দেশে ফিরে এখন তাঁরা নিজেদের কর্মস্থলে ফেরা নিয়েই দিশেহারা।
ইন্টারভিউ বিলম্ব ও কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা
প্রতি বছর ভারতের হাজার হাজার দক্ষ আইটি কর্মী ছুটিতে দেশে ফেরেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন কনস্যুলেটগুলি ভিসা ইন্টারভিউয়ের তারিখ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ায় এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অনেক পেশাদারের ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে এলেও তাঁরা ফিরতে পারছেন না। এর ফলে কেবল তাঁদের চাকরিই ঝুঁকির মুখে নেই, বরং তাঁদের পরিবার এবং যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তোলা স্থায়ী জীবনও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
নিরাপত্তার নামে কেন ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ?
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নির্দেশিকায় H-1B এবং H-4 আবেদনকারীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া যাচাই বা ‘ভেটিং’ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক ও কঠোর করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে এই দীর্ঘমেয়াদী যাচাই প্রক্রিয়ার কারণে ভিসা অনুমোদনে অতিরিক্ত সময় লাগছে, যা সাধারণ কর্মীদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। ব্যক্তিগত ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের ওপর এই কড়া নজরদারি অনেক সময় প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যার মাশুল গুনছেন দক্ষ কর্মীরা।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও ভারতীয়দের ভবিষ্যৎ
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মূলে রয়েছে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান সুরক্ষা। কিন্তু H-1B ভিসার ফি বৃদ্ধি এবং গ্রিন কার্ড নীতির পরিবর্তন কার্যত বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিরুৎসাহিত করার একটি হাতিয়ার। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ও অতি দক্ষ কর্মীরা, যারা মার্কিন অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, আজ তাঁরাই ব্রাত্য হয়ে পড়ছেন। যে এইচ-১বি ভিসার মাধ্যমে একজন কর্মী সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত আমেরিকায় থেকে কাজ করার সুযোগ পান, সেই আইনি পথটিকেই এখন কাঁটা বিছানো করে তোলা হচ্ছে।
ভারত এবং আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি বড় স্তম্ভ হলো এই দক্ষ মানবসম্পদ। কিন্তু বর্তমান ভিসা জটিলতা দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণকেও প্রভাবিত করতে পারে। হাজার হাজার আইটি কর্মীর এই হাহাকার কেবল একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি মানবিক সংকটও বটে। ভারত সরকারের উচিত এই মুহূর্তে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা বাড়িয়ে প্রবাসী ভারতীয়দের স্বার্থরক্ষা করা। অন্যথায়, মেধার এই অবমূল্যায়ন এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ কেবল ভারতীয় কর্মীদের নয়, দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
