
সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথে। বাংলাদেশে হিন্দু যুবক দীপু দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেয়ালে এক বড় আঘাত হেনেছে। এই বর্বরতার প্রতিবাদে এখন উত্তাল ভারতের বাণিজ্য নগরী মুম্বই। কিন্তু এই প্রতিবাদের পথও মসৃণ হয়নি; বরং পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ভিএইচপি (VHP) কর্মীদের হেনস্থার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাতে পিছপা হননি ভারতীয় মুসলিম সমাজ ও আলেমগণ। অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশনের প্রধান ইমাম ড. ওমর আহমেদ ইলিয়াসি এবং বিশিষ্ট আলেম সাজিদ রশিদী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘বর্বরতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ইসলামের শিক্ষা কখনো অন্য ধর্মের মানুষের ওপর অত্যাচার বা হত্যা সমর্থন করে না। ভারতীয় আলেম সমাজের এই কড়া বার্তা স্পষ্ট করে দেয় যে, মানবতার কোনো সীমানা নেই এবং অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা উচিত।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মুম্বইয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের ওপর চড়াও হয়েছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে এলোপাথাড়ি লাঠিচার্জের, যেখানে আহত হয়েছেন অনেক প্রতিবাদী। ১৯ জন আন্দোলনকারীর ওপর একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করার এক করুণ দৃষ্টান্ত। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর এই কঠোরতা কেন? কেন বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়াটাই অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে?
প্রতিবাদের এই আবহে আঙুল উঠেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকেও। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক প্রধানের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু নিগ্রহের ঘটনায় যেখানে সারা দেশ ফুঁসছে, সেখানে দায়িত্বশীল পদের অধিকারী ব্যক্তিদের এই মৌনতা অনেক সময় ‘তোষণ রাজনীতি’র তকমা পায়। সমালোচকদের মতে, ভোটের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোই ছিল প্রকৃত রাজধর্ম।
বিচারের বাণী যখন নীরবে নিভৃতে কাঁদে, তখন সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বাংলাদেশে দীপু দাসের মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে মুম্বইয়ের রাজপথে রক্তপাত—দুই-ই প্রমাণ করে যে সহনশীলতার জায়গাটি সংকীর্ণ হয়ে আসছে। অরাজকতা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে যখনই কোনো পক্ষ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে, তখনই উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুই দেশের সরকারকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। বর্বরতার কোনো ধর্ম হয় না, তাই বিচার হতে হবে দৃষ্টান্তমূলক। অন্যথায় এই ক্ষোভের আগুন আগামী দিনে আরও বড় কোনো সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। আমরা কি তবে এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছি যেখানে প্রতিবাদের ভাষা হবে মামলা আর লাঠিচার্জ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ সময়ের দাবি।।
