
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা কি তবে বেজেই গেল? ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডায় যখন রাজ্যবাসী পিকনিকের মুডে, ঠিক তখনই রাজনীতির পারদ চড়াতে ময়দানে নামছেন তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণ যাত্রা’—যা রাজনৈতিক মহলের মতে বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা’র এক প্রকার কৌশলী অনুকরণ। বিরোধী শিবিরের ঘরানা মেনেই জেলা সফর আর জনসংযোগের এই মেগা ফরম্যাটকে হাতিয়ার করে অভিষেক এখন উন্নয়নের খতিয়ান বা ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে মরিয়া। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই পাঁচালি কি কেবলই ভাতার মহিমা, নাকি এতে কর্মসংস্থান আর শিল্পের কোনো বাস্তবসম্মত ছন্দ থাকবে?
আগামী ২৯ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তর থেকে দক্ষিণ—রাজ্য চষে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছেন অভিষেক। বিষ্ণুপুর থেকে কোচবিহার, ইটাহার থেকে কাঁথি—তালিকা বেশ লম্বা। এই সফরের মূল আকর্ষণ ‘সেবাশ্রয়’, যেখানে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন সাধারণ মানুষ। ২০২১-এ ছিল ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’, চব্বিশে ছিল ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’, আর ছাব্বিশের তুরুপের তাস হতে চলেছে ‘উন্নয়নের প্রচার’ তবে শুধুই প্রচার নয় হওয়া কাজের খতিয়ানের পর্যবেক্ষণ করা তার প্রধান লক্ষ্য। শুক্রবার ও রবিবারের ভার্চুয়াল বৈঠকে দলীয় কর্মীদের সেই ‘নীল নকশা’ই বুঝিয়ে দেবেন যুবরাজ।
তৃণমূল যখন উন্নয়নের পাঁচালি গাইতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বিরোধী শিবির ও সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ তুলছেন এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। রাজ্যের মানুষ কি এতটাই বোকা যে কেবল কয়েকশো টাকার ভাতায় ভবিষ্যৎ ভুলে থাকবেন? অভিযোগ উঠছে, কর্মসংস্থানহীন এই রাজ্যে যুবসমাজের সামনে আজ দিশাহারা পরিস্থিতি। যখন পাশের রাজ্যগুলো বৃহৎ শিল্পের হাতছানি দিচ্ছে, তখন বাংলার মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ হয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন।
উন্নয়নের এই আবহে সবথেকে বেশি চর্চায় উঠে আসে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া উপার্জনের দাওয়াই। চায়ের দোকানে কেটলি হাতে বসা বা বউয়ের বানানো ঘরোয়া ঘুগনি বিক্রি করে সংসার চালানোর যে পরামর্শ তিনি দিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন এটাই কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যত?সমালোচকদের মতে, যে রাজ্যে এম.এ, পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা হকারি করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে ‘চায়ের সাথে ঘুগনি’ বিক্রিকে উপার্জনের পথ হিসেবে দেখানো আদতে রাজ্যের করুণ পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। রাজ্য কি তবে সত্যিই শিল্পের অভাবে ‘অতলে’ তলিয়ে যাচ্ছে? উন্নয়নের পাঁচালিতে কি কোথাও লেখা থাকবে সিঙ্গুর পরবর্তী বন্ধ কলকারখানার দীর্ঘশ্বাসের কথা?
আরজি কর পরবর্তী আবহে ছাব্বিশের লড়াই তৃণমূলের কাছে যে অনেক বেশি কঠিন, তা ঘরোয়া আলোচনায় মানছেন নেতারাও। তাই এবার আর শুধু আবেগে নয়, বরং উন্নয়নের খতিয়ান দিয়ে মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করছেন অভিষেক। কিন্তু জনসভা আর ভার্চুয়াল বৈঠকে কর্মীদের উজ্জীবিত করা গেলেও, সাধারণ মানুষের খালি পকেট আর বন্ধ কারখানার গেটগুলোর উত্তর দেওয়া কি এতই সহজ হবে?
তৃণমূলের দাবি, উন্নয়নের সুফল প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছেছে। বিপরীতে দাঁড়িয়ে জনতার প্রশ্ন—উন্নয়ন মানে কি কেবল রাস্তা আর আলো, নাকি ডাস্টবিনে পড়ে থাকা উচ্চশিক্ষার শংসাপত্র? উত্তর দেবে ছাব্বিশের ব্যালট বক্স। আপাতত অভিষেকের এই ‘পর্যবেক্ষণ যাত্রা’ বাংলার রাজনীতিতে কতখানি ধুলো ওড়াতে পারে, সেটাই দেখার বিষয়।।
