
স্নিগ্ধা চৌধুরী
কথায় আছে, কাছের ঢোল দূরে শোনে না। বাংলার রাজনীতিতে বামেদের অবস্থান নিয়েও আজ অনেকটা তেমনই অভিযোগ উঠছে। দূরের গাজা, প্যালেস্টাইন বা বিশ্বের নানা প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বামেরা যতটা উচ্চকণ্ঠ, বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশে বা ভারতের ভেতরে কিছু অস্বস্তিকর ঘটনায় তারা কেন তুলনায় কম শোনা যায়, এই প্রশ্নই ঘুরে ফিরে সামনে আসছে। এই অভিযোগ ঘিরেই তৈরি হয়েছে এক শক্ত রাজনৈতিক ন্যারেটিভ, যা বাম রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এই বিতর্ক আসলে কেবল প্রতিবাদের পরিমাণ নিয়ে নয়, বরং রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই। বাম রাজনীতি নিজেকে বরাবরই শোষিত বনাম শোষকের লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছে। ধর্ম, জাতি বা দেশের সীমারেখা সেখানে গৌণ; মুখ্য হয়ে ওঠে মানুষের উপর হওয়া অন্যায়ের বিরোধিতা। সেই দর্শন থেকেই বাম শিবিরের দাবি, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হোক বা ভারতে সাম্প্রদায়িক হিংসা, সব ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান একই।
তবে প্রশ্ন ওঠে দৃশ্যমানতা নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর রাজনীতির যুগে যে প্রতিবাদ চোখে পড়ে না, তাকে অনেকেই গুরুত্ব দিতে চান না। বামেরা এখনও বড় অংশে বিশ্বাস করে মাঠের রাজনীতিতে, মিছিল, সভা, পাড়া-মহল্লার সংগঠনে। ফলে সেই প্রতিবাদ অনেক সময় ট্রেন্ডিং তালিকায় জায়গা পায় না, সংবাদচর্চার কেন্দ্রে আসে না। এখান থেকেই নীরবতার অভিযোগ আরও জোরালো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সিপিআইএম-এর নতুন প্রজন্ম নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছে। তাদের লক্ষ্য মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা। চায়ের দোকান, কলেজ ক্যাম্পাস, শ্রমিক এলাকা এই সব জায়গাতেই তারা রাজনীতির ভাষা পৌঁছে দিতে চায়। ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক সহাবস্থান এবং সমতার ধারণাকে তারা ভবিষ্যৎ বাম রাজনীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরছে।
তবুও আত্মসমালোচনার জায়গা থেকেই যায়। আজকের রাজনীতিতে ন্যারেটিভের লড়াই উপেক্ষা করা যায় না। আদর্শ যতই দৃঢ় হোক, তা যদি সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছতে না পারে, তাহলে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ থেকেই যায়। বামেদের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মাঠে সক্রিয় থাকা এবং একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থান জনমানসে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন সেই চূড়ান্ত পরীক্ষার মঞ্চ। তখনই বোঝা যাবে, গাজা থেকে ঢাকা পর্যন্ত এই বিতর্কে বাম রাজনীতির ব্যাখ্যা বাংলার মানুষের মনে কতটা জায়গা করে নিতে পারে। আদর্শ যদি বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়, তবেই নীরবতার অভিযোগ ধীরে ধীরে ফিকে হবে।
