
বাংলার রাজনীতির ময়দানে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ শব্দবন্ধটি কয়েক দশক ধরে এক অমীমাংসিত রূপকথার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতিবার নির্বাচনের আগে এই পরিকল্পনাটি আলমারি থেকে বের করা হয়, ধুলো ঝেড়ে আশার আলো দেখানো হয়, আর ভোট মিটে গেলেই তা পুনরায় ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে। ঘাটালের সাংসদ তথা অভিনেতা দেব (দীপক অধিকারী) সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, মাস্টার প্ল্যানের জন্য ৫০০ কোটি টাকা মঞ্জুর হয়েছে এবং কাজ কীভাবে হবে তা ইঞ্জিনিয়ারদের বিষয়। সাংসদ হিসেবে তাঁর কাজ ছিল টাকা আনা, বাকিটা ‘টেকনিক্যাল’। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সাধারণ মানুষ কি কেবল এই টেকনিক্যাল অজুহাত শোনার জন্যই বারবার তাঁদের মূল্যবান ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন?
বিগত লোকসভা নির্বাচনের আগে দেবের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই তিনি ফের লড়াইয়ে নামেন। মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের প্রিয় নায়ক হয়তো এবার জলযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চলতি বছরের বর্ষায় ঘাটাল ফের একবার নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছিল। ঘরবাড়ি হারিয়ে, গবাদি পশু খুইয়ে যখন মানুষ ত্রাণের লাইনে দাঁড়ান, তখন তাঁদের কাছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জটিল তত্ত্ব বা ৫০০ কোটি টাকার খতিয়ানের চেয়ে মাথার ওপর একটা শুকনো ছাদ এবং এক মুঠো অন্নের প্রয়োজন বেশি থাকে।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে দীর্ঘকাল ধরে কেন্দ্র-রাজ্য চাপানউতোর চলেছে। রাজ্য বলে কেন্দ্র টাকা দিচ্ছে না, আর কেন্দ্র বলে রাজ্য সঠিক পরিকল্পনা পাঠাচ্ছে না। এই রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি খেলায় সাধারণ মানুষ আদতে ‘বলির পাঁঠা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সাংসদ বা বিধায়করা যখন বলেন কাজটা ‘টেকনিক্যাল’, তখন তাঁরা পরোক্ষভাবে নিজেদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যান। টাকা মঞ্জুর হওয়াটা অবশ্যই বড় পদক্ষেপ, কিন্তু সেই কাজ কবে শেষ হবে বা আদৌ তা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না, তা দেখার নৈতিক দায়িত্ব কিন্তু জনপ্রতিনিধিদেরই।
ভোটের আগে শীতের উপহারের পসরা সাজিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া নেতা-মন্ত্রীরা কি অনুভব করতে পারেন সেই বৃদ্ধার কষ্ট, যাঁর সারা জীবনের সঞ্চয় এক রাতের বন্যায় ভেসে যায়? সাধারণ মানুষ ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বোঝে না, তাঁরা বোঝে বছরের পর বছর ধরে চলা তাঁদের ভোগান্তি। সাংসদ হিসেবে দেবের সততা নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায়, কেবল টাকা নিয়ে আসাই শেষ কথা নয়। প্রকল্পের কাজ যাতে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁসে আটকে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও নেতৃত্বের কাজ।
সাংসদের কাছে অনুরোধ অন্যের দিকে তির না ঘুরিয়ে যে বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে আজ আপনি সাংসদ সেইদিকে দৃষ্টিপাত করা আপনার কর্তব্য।ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান যেন কেবল ভোটের ইশতেহারের বিষয় হয়ে না থাকে সেটাই দেখার।প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন নিয়মিত ঘটনা। মানুষের ধৈর্য আজ শেষ সীমায়। টেকনিক্যাল অজুহাতের আড়ালে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব যদি ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে আগামী দিনে সাধারণ মানুষ হয়তো আর কোনো ‘মাস্টার প্ল্যান’- এর ওপর তাদের এই আস্থা রাখবেন না। রাজনীতির চাল নয়, ঘাটালের মানুষ এখন সত্যি সত্যি মাটির ওপর দাঁড়িয়ে জলমুক্ত নিশ্বাস নিতে চায়। তাই সেই দিকটাও রাজনীতির উর্ধ্বে গিয়ে সাংসদ ও জনপ্রতিনিধিদের লক্ষ্য রাখা একান্ত প্রয়োজন।।
