
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিউটাউনের বুকে স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আগামী সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর নিউটাউনে প্রস্তাবিত ‘দুর্গাঙ্গন’ প্রকল্পের শিলান্যাস ও ভিতপুজো করবেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে। ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা পাওয়া বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যকে সারা বছর ধরে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতেই এই মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজ্য সরকার।
হিডকোর (HIDCO) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই বিশাল সাংস্কৃতিক প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৬১ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা। তিন বছর আগে দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পাওয়ার পরই রাজ্যে এমন একটি স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ার পরিকল্পনা শুরু হয়। চলতি বছরের ২১ জুলাই শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছিলেন যে, নিউটাউনে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘দুর্গাঙ্গন’ তৈরি হবে। আগস্ট মাসে এর টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৭ সালের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হবে।
দীঘার জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে শিলিগুড়ির মহাকাল মন্দির—সাম্প্রতিক সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় পরিকাঠামো নির্মাণের জোয়ার দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিউটাউনের এই ‘দুর্গাঙ্গন’ নির্মাণের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী পরোক্ষভাবে হিন্দু ভাবাবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিতে চাইছেন। বিজেপি যেখানে বারবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু-বিরোধী’ তকমা লাগানোর চেষ্টা করে, সেখানে দুর্গাপুজোর জন্য এমন স্থায়ী স্থাপত্য নির্মাণ শাসক শিবিরের একটি বড় রাজনৈতিক চাল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে এই উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, একের পর এক মন্দির বা ধর্মীয় স্থাপত্য তৈরি করে মুখ্যমন্ত্রী আসলে হিন্দুদের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, রাজ্যে কর্মসংস্থান বা শিল্পের বদলে কেন শত শত কোটি টাকা ধর্মীয় প্রকল্পে খরচ করা হচ্ছে?
একইসঙ্গে উঠে আসছে কিছু জ্বলন্ত বিতর্ক:
তোষণ রাজনীতির অভিযোগ:সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অতি-তোষণের যে অভিযোগ বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার আনা হয়, মন্দির তৈরি করে কি তা আড়াল করা সম্ভব?
অনুপ্রবেশ ইস্যু: রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত সমস্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ রয়েছে, তার প্রভাব কি আসন্ন ভোটে পড়বে না?
ভোটের অঙ্ক: ২৬-এর নির্বাচনের আগে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতেই কি এই তড়িঘড়ি শিলান্যাস?
দীঘার জগন্নাথ মন্দির ইতিমধ্যেই পর্যটন মানচিত্রে সাড়া ফেলেছে এবং সরকারের আয় বাড়িয়েছে। নিউটাউনের দুর্গাঙ্গনও বিশ্ব পর্যটনের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হবে বলে আশাবাদী প্রশাসন। তবে কোটি কোটি টাকার এই চাকচিক্য বাংলার মানুষের মনের ক্ষত কতটা উপশম করতে পারবে, তা সময়ই বলবে। সংখ্যালঘু তোষণ বনাম হিন্দু মন্দির—এই দুইয়ের দোলাচলে ২৬-এর ব্যালট বাক্স শেষ পর্যন্ত কার দিকে ঝুঁকে থাকে, সেটাই এখন দেখার।
