
একুশে ফেব্রুয়ারি—এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকার রাজপথ, সালাম-বরকত-রফিক-জব্বরদের রক্ত আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ সেই কালজয়ী সুর। ১৯৫২ সালের সেই দিনটিই ছিল আধুনিক বাংলাদেশের জন্মের বীজ। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু ভাষার টানে বাঙালি একজোট হয়েছিল বলেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সরকারি ক্যালেন্ডার যে ছবিটা দেখাচ্ছে, তা দেখে শিউরে উঠছেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার একুশে ফেব্রুয়ারির ছুটি বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে বইছে তীব্র প্রতিবাদের ঝড়
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এই ঘটনাকে সরাসরি ‘আত্মঘাতী’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার প্রতি যে আবেগ আর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের যে স্বীকৃতি, তার পুরোটাই তো বাংলাদেশের অবদান। আজ যদি বাংলাদেশ নিজেই নিজের সেই গৌরবকে অস্বীকার করে, তবে তা হবে নিজের শিকড় কেটে ফেলার শামিল। শীর্ষেন্দু বাবুর আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত আসলে গভীর এক মৌলবাদী চক্রান্তের অংশ। শুধু ভাষা দিবস নয়, সরস্বতী পুজো, জন্মাষ্টমী বা বুদ্ধ পূর্ণিমার মতো ধর্মীয় উৎসবের ছুটি ছেঁটে ফেলা আসলে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী পরিচয়কে ধ্বংস করারই নামান্তর।
একই সুরে আক্ষেপ ঝরে পড়েছে ভাষাবিদ পবিত্র সরকারের গলায়। তিনি মনে করেন, নিজেদের ইতিহাসকে এভাবে লাঞ্ছিত করার নজির পৃথিবীতে খুব কম আছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এরপর কি তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি তুলে নেওয়ার জন্য ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করবে বাংলাদেশ? তাঁর আশঙ্কা আরও গভীর—হয়তো এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা জাতীয় সঙ্গীত বর্জন বা পাকিস্তানের সেই পুরনো ‘দাসত্বে’ ফিরে যাওয়ার দাবিও উঠতে পারে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের এই সঙ্কটে এপার বাংলার মানুষের মনে বিষণ্ণতা আর বিতৃষ্ণা দুই-ই বাড়ছে।
কবি সুবোধ সরকার আবার ইতিহাসের অমোঘ শক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, দেওয়ালে চুনকাম বা ‘হোয়াইটওয়াশ’ করে কি আর রক্তে লেখা ইতিহাস মুছে দেওয়া যায়? একাত্তরের লড়াই বা মুজিবের অবদানকে ন্যারেটিভ বদলে ঢেকে দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতার বইয়ের রেশ টেনেই তিনি বলতে চেয়েছেন, ইতিহাসকে মুছে ফেলার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য।
আসলে একটি দেশের পরিচয় গড়ে ওঠে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। একুশে ফেব্রুয়ারির ছুটি বাতিল করা মানে স্রেফ ক্যালেন্ডারের একটি পাতা বদল নয়, বরং কয়েক কোটি মানুষের লড়াই আর আবেগকে অপমান করা। আজ যখন গোটা পৃথিবী বাংলা ভাষাকে সম্মান জানাচ্ছে, তখন খোদ বাংলাদেশেই যদি সেই ভাষার গুরুত্বকে খাটো করা হয়, তবে তাকে আত্মঘাতী ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! মৌলবাদের এই চোরাস্রোত যদি ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়গুলোকে ধুয়ে দিতে চায়, তবে তা আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক অন্ধকার ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।।
