
স্নিগ্ধা চৌধুরী
রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তটি আসে তখনই, যখন ক্ষমতা নিজের প্রতিচ্ছবিতেই বিশ্বাস করতে শুরু করে। রাজ্যের শাসনব্যবস্থা আজ ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে। চারদিকে উন্নয়নের হিসাব, প্রকল্পের তালিকা, সরকারি সাফল্যের পরিসংখ্যান, সবকিছু এতটাই সুচারু, এতটাই নিখুঁতভাবে পরিবেশিত, যে প্রশ্ন করাটাই যেন অপরাধ। অথচ রাজনীতির আসল বিচার হয় কাগজে নয়, মানুষের জীবনে। আর সেই জীবন আজ প্রশ্নে ভরা, চাকরি কোথায়, নিরাপত্তা কোথায়, স্বচ্ছতা কোথায়?
একসময় যে সরকার নিজেকে সংগ্রামের প্রতীক বলে তুলে ধরেছিল, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সংগ্রামের মানুষই। এসএসসি আন্দোলন, নিয়োগ বাতিল, আদালতের নির্দেশ, এসব শুধু আইনি ঘটনা নয়, এগুলো রাজনৈতিক চরিত্রের উন্মোচন। যোগ্যদের চোখে জল, হাতে প্ল্যাকার্ড, আর মুখে একটাই প্রশ্ন, আমাদের দোষটা কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর উন্নয়ন প্রকল্পে পাওয়া যায় না। কারণ চাকরি কোনো অনুদান নয়, চাকরি অধিকার। আর অধিকার যখন ভিক্ষার জায়গায় নামিয়ে আনা হয়, তখন শাসনের ভাষা যত মধুরই হোক, বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।
এই ভাঙনটা খুব চুপচাপ ঘটে। টেলিভিশনের ক্যামেরা তার শব্দ ধরে না। মানুষ তখন আর তর্কে যায় না, বিতর্কে যায় না। তারা শুধু মনে মনে তুলনা করে। কে দায় এড়াচ্ছে, কে দায় নিতে চাইছে। কে শুধু বলছে , সব ষড়যন্ত্র , আর কে বলছে , ব্যবস্থা বদলাতে হবে । দীর্ঘ শাসনের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই, সব ভুলের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, কিন্তু সব ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয় না।
ঠিক এই শূন্যস্থানেই অন্য রাজনীতি জায়গা করে নেয়। এখানে আবেগের চেয়ে যুক্তি বেশি কাজ করে। এখানে বড় বড় প্রতিশ্রুতির দরকার পড়ে না, দরকার পড়ে প্রশ্ন করার সাহস। চাকরির প্রশ্ন, দুর্নীতির প্রশ্ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন, এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কিন্তু বারবার ওঠা মানেই ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা। আর ধারাবাহিক ব্যর্থতা যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন পরিবর্তনের ধারণাটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে।
রাজ্যের মানুষ আজ আর কাউকে দেবতার আসনে বসিয়ে ভোট দিতে চাইছে না। তারা চায় হিসাব। তারা দেখতে চায়, কে কেবল শাসন করছে, আর কে শাসন পাল্টানোর কথা বলছে। এই পার্থক্যটাই আগামী নির্বাচনের অক্ষর হয়ে উঠছে। যারা এতদিন ক্ষমতার গল্প শুনেছে, তারা এবার ফলের গল্প দেখতে চায়। শুধু প্রকল্প নয়, শুধু ভাষণ নয়। বাস্তব জীবনের পরিবর্তন।
২০২৬ তাই কোনো আকস্মিক বিপ্লবের গল্প নয়। এটা জমে ওঠা অসন্তোষের স্বাভাবিক পরিণতি। যারা ভেবেছিল প্রশাসনিক দৃঢ়তাই শেষ কথা, তারা বুঝতে পারেনি, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে ব্যালট। আর ব্যালট কোনো দলের স্মৃতিচারণা শোনে না, সে শুধু বর্তমানের জবাব চায়।
ইতিহাসের এক নির্মম নিয়ম আছে, যে শাসন প্রশ্নকে শত্রু ভাবে, সে একদিন প্রশ্নেই হেরে যায়। রাজ্যের রাজনীতি এখন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দৃশ্যমান শক্তি একদিকে, অদৃশ্য জনরায় অন্যদিকে। আর এই দুইয়ের সংঘর্ষেই ২০২৬ নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছে।
