
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বাংলা সফরের পরিপ্রেক্ষিতে এক দীর্ঘ সাংবাদিক সম্মেলনে সরব হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ২০ মিনিটের এই লাইভ সেশনে তিনি তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে দিয়ে বাংলার দুর্নীতির তদন্ত করাবেন। এর পাল্টা জবাবে অভিষেক বলেন, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতারা “পরিযায়ী পাখির” মতো মাসে একবার করে বাংলায় আসেন এবং বড় বড় কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যাদের পাশে বসিয়ে শাহ দুর্নীতির কথা বলছেন, তারা নিজেরা কতটা স্বচ্ছ? শুভেন্দু অধিকারী বা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো নেতাদের নাম উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বিজেপিতে যোগ দিলেই সব তদন্ত থেমে যায়। ইডি-সিবিআইকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অভিষেকের বক্তব্যের সিংহভাগ জুড়ে ছিল কেন্দ্রের আর্থিক অবরোধ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক হারের বদলা নিতে বিজেপি সরকার বাংলার গরিব মানুষের ওপর আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। কয়েক বছর ধরে ১০০ দিনের কাজের (MGNREGA) মজুরি এবং আবাসন যোজনার টাকা আটকে রাখা হয়েছে। বাংলার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেও টাকা পাচ্ছেন না, যা অত্যন্ত অমানবিক।
অভিষেক পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেন যে, গত সাত বছরে কেন্দ্র বাংলা থেকে ডাইরেক্ট ট্যাক্স ও জিএসটি বাবদ প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন করেন, “বাংলার মানুষের পরিশ্রমের টাকা দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, অথচ আমাদের হকের টাকা ফেরত দেওয়ার সময় কেন এত শর্ত আর অজুহাত?”
বিজেপি দাবি করেছে তারা বাংলাকে ১০ লক্ষ কোটি টাকা দিয়েছে। এই দাবিকে সরাসরি মিথ্যা বলে অভিহিত করে অভিষেক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন যে, কেন্দ্র যদি সত্যিই টাকা দিয়ে থাকে তবে তারা একটি ‘শ্বেতপত্র’ (White Paper) প্রকাশ করুক। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, তৃণমূল সরকার রাজ্যের সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করছে, আর বিজেপি কেবল মিথ্যে প্রচার করছে।
নাগরিকত্ব এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিয়েও বিজেপিকে বিঁধেছেন অভিষেক। বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকারের “সীমান্ত তুলে দেওয়ার” মন্তব্যের রেশ ধরে তিনি বলেন, একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বর্ডার সুরক্ষার কথা বলেন, অন্যদিকে তাঁরই দলের সাংসদ উল্টো কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, মতুয়াদের নাগরিকত্বের নামে বিজেপি আসলে প্রতারণা করছে এবং ভোটব্যাঙ্ক গোছাতে চাইছে।
বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি ও আবেগ বোঝে না বলে অভিযোগ করেন অভিষেক। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন থেকে শুরু করে ঝুলন গোস্বামী বা অভিনেতা দেব—বাংলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের যেভাবে অপমান ও হেনস্থা করা হচ্ছে, তার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। তাঁর মতে, যে দল একজন নোবেলজয়ীকে সরাতে চায়, তাদের থেকে বাংলার মঙ্গল আশা করা যায় না।
পরিশেষে অভিষেক মনে করিয়ে দেন, ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী নিজেও ‘দোশো পার’ স্লোগান দিয়েছিলেন, কিন্তু মানুষ তার উত্তর ব্যালট বক্সে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেন, ২০২৬-এর লড়াই হবে দিল্লির ‘অহংকার’ বনাম বাংলার ‘অধিকারের’। তৃণমূলকে হারানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি বা নৈতিক বল বিজেপির নেই এবং আগামী দিনে বাংলার জনগণই এর যোগ্য জবাব দেবেন।।
