
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক রায়টি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের এক নীরব যন্ত্রণাকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। ৩০ জানুয়ারি ২০২৬-এর এই যুগান্তকারী ঘোষণায় আদালত স্পষ্ট করেছে যে, ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি (MHM) কেবল স্যানিটেশন বা পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, এটি সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি কিশোরীর ‘মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার’ মৌলিক অধিকার। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে যে, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বা ‘পিরিয়ড হাইজিন’ কোনো দয়া বা সুযোগ-সুবিধা নয়, বরং এটি জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ—তখন বুঝতে হবে সমাজ হিসেবে আমরা এক দীর্ঘস্থায়ী অন্যায়ের প্রতিকারের পথে পা বাড়িয়েছি। বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং আর. মহাদেবনের বেঞ্চের এই রায় কেবল আইনি নির্দেশিকা নয়, বরং এটি আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর মূলে একটি প্রয়োজনীয় আঘাত। মর্যাদা কোনো বিমূর্ত ধারণা হতে পারে না; এটি তখনই দৃশ্যমান হয় যখন একজন শিক্ষার্থীকে তার শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার জন্য লজ্জা, বর্জন বা অপমানের শিকার হতে হয় না।
বাস্তবতা অত্যন্ত রূঢ়। আমাদের দেশের হাজার হাজার স্কুলে আজও মেয়েদের জন্য কার্যকর ও পৃথক শৌচাগারের অভাব রয়েছে। জলের প্রাপ্যতা এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহ বা তা ফেলার নিরাপদ ব্যবস্থার অভাবে বহু কিশোরী মাসে অন্তত কয়েক দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। এই ধারাবাহিক অনুপস্থিতি এক সময় তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত স্কুলছুটের মতো দুঃখজনক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। আদালত ঠিকই বলেছে, রাষ্ট্র কোনো শিশুকে তার ‘মর্যাদা’ এবং ‘শিক্ষা’—এই দুটির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে না। স্যানিটারি ন্যাপকিন বা গোপনীয়তার অভাব যদি একজন ছাত্রীর শিক্ষার অন্তরায় হয়, তবে তা সরাসরি লিঙ্গ-বৈষম্য এবং শিক্ষার অধিকার (RTE) আইনের চরম লঙ্ঘন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশগুলো এবার অত্যন্ত নির্দিষ্ট এবং সময়োপযোগী। শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে প্রতিটি স্কুলে লিঙ্গ-বিভাজনযোগ্য শৌচাগার নির্মাণ, ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে বিনামূল্যে ‘অক্সো-বায়োডিগ্রেডেবল’ ন্যাপকিন সরবরাহ এবং জরুরি অবস্থার জন্য ‘MHM কর্নার’ স্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বেসরকারি স্কুলগুলো যদি এই মানদণ্ড না মানে, তবে তাদের স্বীকৃতি বাতিলের কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, আদালত মাসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষা পরিকাঠামোর একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখতে চায়।
তবে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। ঋতুস্রাবকে ঘিরে যে গভীর সামাজিক ‘ট্যাবু’ রয়েছে, তা ভাঙতে হবে ভেতর থেকে। আদালত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই ‘ঋতুস্রাবে পুরুষদের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি আলাদা বিভাগ যুক্ত করেছে। স্কুলে পুরুষ শিক্ষক এবং ছাত্ররা যদি ঋতুস্রাবের জৈবিক সত্যটি সহজভাবে গ্রহণ করতে না পারে, তবে পরিকাঠামো থাকলেও কিশোরীরা মানসিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে না। কটূক্তি বা হয়রানি বন্ধ করতে হলে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও সচেতনতামূলক আলোচনা প্রয়োজন। পিরিয়ড যে কোনো অসুখ নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক স্পন্দন—এই বোধটি সকল ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আমাদের নীতি-নির্ধারক ও প্রশাসনের জন্য এক সতর্কবার্তা। বাজেট বরাদ্দ থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ—প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। আমরা যখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখি, তখন যদি দেশের অর্ধেক জনশক্তি কেবল পরিকাঠামোর অভাবে বা লজ্জায় পিছিয়ে পড়ে, তবে সেই প্রগতি অর্থহীন।
মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল মেয়েদের বিষয় নয়; এটি সমতা, শিক্ষা এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সেই নীরবতার দেয়ালে একটি বড় ফাটল ধরিয়েছে। এখন দায়িত্ব আমাদের—এই নির্দেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা দেখা, দাবি তোলা, এবং স্কুলকে এমন জায়গা বানানো যেখানে কোনও মেয়ে শিশুকে তার শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার জন্য পিছিয়ে পড়তে না হয়। স্কুল হোক এমন এক নিরাপদ প্রাঙ্গণ যেখানে প্রতিটি কন্যা শিশু তার শরীরের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে মাথা উঁচু করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।।
