
বাঙালির হেঁশেলে বৃহস্পতিবার মানেই শুদ্ধতা আর নিরামিষের এক স্নিগ্ধ আয়োজন। আর নিরামিষ রান্নাকে যদি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব কাউকে দিতে হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। জোড়াসাঁকোর অন্দরমহলে রান্নাবান্না কেবল উদরপূর্তির মাধ্যম ছিল না, ছিল সৃজনশীলতার এক বিশাল চারণভূমি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ—বাড়ির প্রতিটি সদস্যের খাবারের রুচি ছিল অত্যন্ত মার্জিত এবং বৈচিত্র্যময়। ঠাকুরবাড়ির এই অসাধারণ সব রেসিপি এবং তাঁদের হেঁশেলের বিবর্তন সম্পর্কে আমরা জানতে পারি পূর্ণিমা ঠাকুরের কালজয়ী বই ‘ঠাকুরবাড়ির রান্না’ থেকে। পূর্ণিমা ঠাকুর ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতবউ। তিনি পরম মমতায় ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সেইসব হারিয়ে যাওয়া স্বাদকে সাধারণের নাগালে নিয়ে এসেছেন। আজ তেমনই এক রাজকীয় নিরামিষ পদ হলো ‘বেগুন কোরমা’। কোনো রকম পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই দই আর হিংয়ের জাদুকরী মিশেলে এই রান্নাটি নিরামিষ খাবারের সংজ্ঞাই বদলে দেয়।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
এই বনেদি রান্নাটি করতে আপনার প্রয়োজন হবে:
- প্রধান সবজি: ৩-৪টি লম্বাটে বেগুন (ফালি করে কাটা)।
- মশলা ও বাটা: ২০০ গ্রাম ফেটানো টক দই, ১ কাপ টমেটো কুচি, আধ চা চামচ আদা বাটা, এক চিমটি হিং (জলে গোলা)।
- ফোড়ন: ১টি তেজপাতা এবং থেঁতো করা গরম মশলা (এলাচ, লবঙ্গ ও দারচিনি)।
- গুঁড়ো মশলা: হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কাগুঁড়ো, সামান্য শাহ জিরে গুঁড়ো এবং এক চিমটি জয়িত্রী।
- অন্যান্য: সরষের তেল, স্বাদমতো নুন ও চিনি, এবং রান্নার স্বাদ বৃদ্ধিতে সামান্য ঘি।
প্রস্তুত প্রণালী
ঠাকুরবাড়ির এই নিরামিষ বেগুন কোরমা তৈরির পদ্ধতিটি বেশ সহজ অথচ পরিশীলিত। প্রথমে বেগুনের টুকরোগুলোতে সামান্য নুন ও হলুদ মাখিয়ে সরষের তেলে হালকা করে ভেজে তুলে রাখতে হবে; খেয়াল রাখতে হবে বেগুন যেন খুব বেশি নরম না হয়ে যায়। এরপর ওই তেলেই তেজপাতা ও থেঁতো করা গরম মশলা ফোড়ন দিয়ে তাতে জলে গুলে রাখা হিংটুকু ঢেলে দিন। হিংয়ের কাঁচা গন্ধ চলে গেলে আদা বাটা, টমেটো কুচি, লঙ্কাগুঁড়ো ও হলুদ দিয়ে মশলাটি ধৈর্য ধরে কষাতে থাকুন। যখন দেখবেন মশলা থেকে তেল আলাদা হতে শুরু করেছে, তখন আঁচ একদম কমিয়ে তাতে ফেটানো টক দই, স্বাদমতো নুন ও চিনি দিন। মশলার গ্রেভিটি ঘন হয়ে এলে আগে থেকে ভেজে রাখা বেগুনগুলো সাবধানে মিশিয়ে দিন এবং ওপর থেকে সামান্য জল দিয়ে মিনিট পাঁচেক ঢাকা দিয়ে রান্না হতে দিন। নামানোর ঠিক আগে ওপর থেকে সামান্য ঘি, শাহ জিরে গুঁড়ো এবং জয়িত্রীর গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ ঢাকা দিয়ে রাখুন। এই শেষ ধাপটিই রান্নায় ঠাকুরবাড়ির সেই বিশেষ সুগন্ধ ও বনেদি স্বাদ নিশ্চিত করবে।
গরম লুচি, রুমালি রুটি কিংবা পরোটার সাথে এই নিরামিষ বেগুন কোরমা পরিবেশন করুন। পূর্ণিমা ঠাকুরের স্মৃতিচারণ করা এই পদটি আপনার সাধারণ নিরামিষ দুপুর বা রাতকে করে তুলবে উৎসবমুখর।।
