
“শাজাহান হোটেলের লাল আলো তখনও জ্বলছে, নিভছে”
স্নিগ্ধা চৌধুরী
স্থবিরতা নেই, আছে বহমানতা। নিভে যাওয়া আলো আবার জ্বলে ওঠে ঠিক তেমনি, শংকরের গল্পও এখনও বাঙালির মনের মণিকোঠায় জীবন্ত। এই ছোট্ট বাক্য থেকেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যের যাত্রা, যেখানে কলকাতার হোটেল, হাইকোর্টের কেরানি, শহরের আড্ডা সবই হয়ে ওঠে গল্পের প্রাণ।
১৯৩৩ সালে যশোর জেলার বনগ্রামে জন্ম নেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। শৈশবেই দেশের বিভাজন, পরিবারে অস্থিরতা এবং স্বাধীনতার আগুন তাঁকে ঘিরে রাখে। পিতৃবিয়োগের বেদনা, হকারি থেকে গৃহপরিচারকের কাজ, অফিস কেরানি সব অভিজ্ঞতা তাঁর লেখার জন্য এক ধরণের জীবন্ত উপকরণ। ১৯৫০-এর দশকে হাওড়ার হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন শহরের মানুষের নানা রূপ, তাদের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং নগরের ছায়াপথ। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’-র সূচনা।
এরপর জন্ম নিল ‘চৌরঙ্গী’, যা কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং মধ্যবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত বাঙালির ভেতরের দ্বন্দ্ব, লোভ, ভণ্ডামি এবং আবেগের প্রতিচ্ছবি। শংকর দেখালেন, কোট-টাই পরা অফিসার, হোটেলের আড্ডার মানুষ, বা শহরের যাঁরা ভোগ আর মর্যাদার ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকেন ওরাও মানুষ, অনুভূতি, অনুশোচনা আর স্বপ্নের মালিক।
শংকরের লেখা যেন শহরকে চোখের সামনে নিয়ে আসে। গ্র্যান্ড, গ্রেট ইস্টার্ন, স্পেনসেস কলকাতার হোটেলগুলো তাঁর চোখে জীবন্ত হয়ে ওঠে। শহরের বার, আড্ডা, লোকালয়ের ক্ষুদ্র-দৃশ্য সবই তাঁর গল্পের রক্তনালি। পাঠকরা শংকরের গল্পে খুঁজে পান নিজেদের ভিতরের ছবি ভোগ, লোভ, দ্বন্দ্ব, আশা আর ক্ষুদ্র আনন্দ।
শংকরের সাহিত্য শুধু গল্প নয়; এটি জীবনকে বুনে তোলার কৌশল। ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘স্থানীয় সংবাদ’ এই সব কালজয়ী উপন্যাসে তিনি মানুষের মানসিক মানচিত্র অঙ্কিত করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে তাঁর গল্পগুলো জীবন পেয়েছে আর বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
বনগ্রামের ছোট্ট মণিশংকর আজও বাঙালির মনের মণিকোঠায় বসে আছে। নিভে যাওয়া আলো আবার জ্বলে ওঠে তাঁর রচনায়, আর পাঠক খুঁজে পায় এক অম্লান শহরের, এক অদম্য বাঙালির চিত্র। শহর, মানুষ, আবেগ, স্বপ্ন সবই তাঁর গল্পে জীবন্ত। এই কারণেই শংকর বাংলা সাহিত্যের এক চিরস্থায়ী স্মৃতি।
