
রক্তে লেখা ভাষার নাম
একুশ জাগায় বাংলার প্রাণ
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন রোদ্দুর ধীরে ধীরে শহরের গায়ে পড়ে, তখন মনে হয়, এই আলো যেন শুধু সূর্যের নয়, ভাষারও। আমাদের মায়ের মুখের প্রথম উচ্চারণ, শৈশবের প্রথম ডাক, কান্না আর হাসির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা যে শব্দের সংসার, তারই নাম মাতৃভাষা। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা আমাদের শিকড়, আমাদের চেতনা, আমাদের আত্মপরিচয়ের আয়না।
১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথ রক্তে রাঙা হয়েছিল। ঢাকা-র বুক চিরে উঠেছিল প্রতিবাদের স্লোগান, তরুণ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল বাংলার অধিকার। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে যারা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ শুধু একটি ভাষার স্বীকৃতির জন্য ছিল না, ছিল আত্মমর্যাদার জন্য, ছিল নিজের পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সেই আন্দোলনের পথ ধরেই একদিন জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলা। আর বহু বছর পরে, ১৯৯৯ সালে UNESCO এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, বিশ্বের সব ভাষার প্রতি সম্মান জানাতে।
ভাষা মানে স্মৃতি। দাদুর গল্প, ঠাকুমার রূপকথা, পাড়ার আড্ডা, গ্রামের মাঠে ভেসে আসা কীর্তনের সুর কিংবা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ভাঙা ভাঙা কথোপকথন, সব মিলিয়ে ভাষা এক জীবন্ত নদী। সে নদী কখনও শান্ত, কখনও উত্তাল; কিন্তু থেমে থাকে না। মাতৃভাষা আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়। এই ভাষাতেই আমরা প্রথম বলি “মা”, এই ভাষাতেই প্রথম লিখি নিজের নাম।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাষার লড়াই হয়তো আর রাজপথে নয়, কিন্তু অন্য এক অদৃশ্য পরিসরে চলছে। বিশ্বায়নের ঝড়ে, প্রযুক্তির দ্রুতগতির দৌড়ে অনেক ছোট ছোট ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। কোনও পাহাড়ি গ্রামের উপভাষা, কোনও আদিবাসী সম্প্রদায়ের কথ্য ভাষা, ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে সময়ের অন্ধকারে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি ভাষাই এক একটি সংস্কৃতি, এক একটি ইতিহাস, এক একটি স্বপ্নের ভাণ্ডার। একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে একটি পৃথিবী হারিয়ে যাওয়া।
বাংলা ভাষা শুধু বর্ণমালার সমষ্টি নয়; এটি রবীন্দ্রনাথের গানের সুর, নজরুলের বিদ্রোহ, জীবনানন্দের নীরবতা, লালনের দর্শন। এই ভাষায় যেমন প্রেম আছে, তেমন প্রতিবাদও আছে; যেমন মায়া আছে, তেমন শক্তিও আছে। তাই মাতৃভাষা দিবস কেবল স্মরণের দিন নয়, প্রতিজ্ঞার দিনও। আমরা যেন নিজের ভাষাকে ভালোবাসি, তাকে সম্মান করি, তাকে শুদ্ধ ও সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করি।
আজ যখন শহরের পথে পথে শহীদ মিনারে ফুল পড়ে, যখন শিশুরা সাদা পোশাকে প্রভাতফেরিতে অংশ নেয়, তখন মনে হয়, ভাষা আসলে আমাদের বেঁধে রাখে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধনে। দেশ ভিন্ন হতে পারে, উচ্চারণ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মায়ের ভাষার টান সর্বত্র এক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তাই কেবল ইতিহাসের পাতা নয়, আমাদের হৃদয়েরও এক চিরসবুজ অধ্যায়, যেখানে ভাষা মানে ভালোবাসা, ভাষা মানে আত্মপরিচয়, ভাষা মানে স্বাধীনতার স্পন্দন।
