
পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে খুব শিগগিরই শপথ নিতে চলেছেন তামিলনাড়ুর সদ্য প্রাক্তন রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঠিক তার আগেই রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের হঠাৎ পদত্যাগ এবং রবির নিয়োগ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন,নির্বাচনের আগে রাজ্যে কি বিশেষ কোনও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে? সেই কারণেই কি একজন কঠোর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রাক্তন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে রাজ্যপালের দায়িত্বে আনা হল?
রবীন্দ্র নারায়ণ রবি ১৯৭৬ ব্যাচের একজন আইপিএস অফিসার। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের গোয়েন্দা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকেই তিনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)-তে কাজ শুরু করেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি শান্ত, ভদ্র ও দক্ষ অফিসার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কাশ্মীরের জঙ্গি পরিস্থিতির সময় আইবির যে বিশেষ ‘কে-গ্রুপ’ কাশ্মীর অপারেশন পরিচালনা করত, রবি সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন এ এস দুলাত, যিনি পরে আইবির প্রধান হন।
কাশ্মীরে কাজ করার পর রবিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের দায়িত্বেও পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে সেই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ করে তোলে। ২০১২-১৩ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ‘ট্র্যাক টু’ বৈঠকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই ধরনের বৈঠকের সরকারি স্বীকৃতি না থাকলেও নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নীতি নির্ধারণে এগুলির বিশেষ গুরুত্ব থাকে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও রবির নাম উঠে আসে। তাঁকে জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় এবং একই সঙ্গে নাগা শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনাকারী বা ইন্টারলোকিউটরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণেই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পণ করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে নাগা সংগঠনগুলির সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এরপর ২০১৯ সালে তাঁকে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল করা হয়। তবে সেখানেও তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নাগা রাজনৈতিক সংগঠন এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দল অভিযোগ তোলে যে তিনি নির্বাচিত সরকারের কাজে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছেন।
২০২১ সালে তাঁকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু সেখানে দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই রাজভবন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। তামিলনাড়ু বিধানসভায় পাস হওয়া একাধিক বিল দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন না দিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি সংক্রান্ত NEET পরীক্ষার বিরোধিতা করে আনা একটি বিল তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ায় বিতর্ক আরও বাড়ে।
শুধু তাই নয়, বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, সরকারের তৈরি করা ভাষণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি পড়েননি। ভাষা নীতি, জাতীয় শিক্ষা নীতি এবং ‘তামিলনাড়ু’ নাম বদলে ‘তামিঝাগম’ করার মন্তব্য নিয়েও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে ‘Get Out Ravi’ পোস্টারও দেখা যায় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়।
এই বিতর্কের মধ্যেই এবার তাঁর গন্তব্য কলকাতার রাজভবন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে তাঁর আগমন নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এখন দেখার বিষয়, বাংলার রাজভবনে দায়িত্ব নেওয়ার পর রবীন্দ্র নারায়ণ রবি কীভাবে নিজের ভূমিকা নির্ধারণ করেন এবং রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর উপস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলে।
