
‘SIR’ ও ‘ভোট-ছাঁটাই’, নবান্নের মসনদে কার শেষ হাসি?
বাংলার রাজনীতি এখন আর কেবল সভার ভিড়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন ইডি-সিবিআইয়ের ফাইল আর ডিজিটালি ফাঁস হওয়া তথ্যের এক গোলকধাঁধা। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে এক চরম ‘অস্তিত্বের লড়াই’। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় ‘মা-মাটি-মানুষ’ ইমেজ, অন্যদিকে মোদির ডিজিটাল সেনাপতি হিরেন যোশীর নিখুঁত ‘SIR অ্যালগরিদম’। বর্তমানে বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে বড় অগ্নিকুণ্ড হল দুটি ‘SIR’। প্রথমটি হল School Information Resource বা নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির পাহাড়। হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীর চোখের জল আজ হিরেন যোশীর ডিজিটাল টিমের প্রধান ‘কন্টেন্ট’। দ্বিতীয়টি হল নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision (SIR)। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়ার পর খসড়া তালিকায় প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ে। পরে বিভিন্ন সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে মোট প্রায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের নথি যাচাই প্রক্রিয়াধীন। এটাই বিজেপির তুরুপের তাস। হিরেন যোশীর ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া ন্যারেটিভ বলছে, ‘অনুপ্রবেশকারী হঠাও, বাংলা বাঁচাও’। অন্যদিকে, নিয়োগ দুর্নীতির ‘SIR’ ডাটাবেস থেকে যেভাবে ওএমআর শিট জালিয়াতির তথ্য বেরোচ্ছে, তা মধ্যবিত্ত বাঙালির নৈতিকতায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। হিরেন যোশী এই দুই ‘SIR’-কে মিলিয়ে এক বিষাক্ত ককটেল তৈরি করেছেন, যা সরাসরি আঘাত করছে তৃণমূলের বিশ্বাসযোগ্যতায়।
হিরেন যোশীর ‘ডিজিটাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’
বিজেপির কাছে বাংলা এখন সম্মানের লড়াই। এখানে হিরেন যোশীর রণকৌশল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং কার্যকর। হিরেন কেবল পোস্ট করেন না, তিনি মানুষের মস্তিষ্কে ‘পারসেপশন’ তৈরি করেন। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কার অ্যাকাউন্টে চুরির টাকা গেল, আর কার জন্য আপনার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল। তাঁর লক্ষ্য, মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া যে, বর্তমান ব্যবস্থাটি আগাগোড়া পচে গেছে। ২৬-এর লড়াইয়ে হিরেন যোশী কোনও প্রথাগত প্রচার করছেন না, তিনি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে প্রতিটি ভোটারের ক্ষোভকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ব্লু-প্রিন্ট সাজিয়েছেন।
কোন কোন ইস্যু আগ্নেয়গিরি?
শিক্ষিত যুবসমাজের বিদ্রোহ: ‘SIR’ কেলেঙ্কারির ফলে বাংলার কয়েক লক্ষ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী আজ দিশেহারা। এই বিশাল অংশটি যদি ঐক্যবদ্ধভাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, তবে সমীকরণ ওলটপালট হতে বাধ্য।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম ‘ভোটাধিকার’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুরুপের তাস ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। কিন্তু বিজেপি পাল্টা প্রচার করছে, ‘৫০০ টাকায় কি আপনার নাগরিকত্ব বিক্রি করবেন?’ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ মানুষের আতঙ্ককে ভোটের বাক্সে রূপান্তর করতে হিরেন যোশীর টিম দিনরাত এক করে দিচ্ছে।
আঞ্চলিক মেরুকরণ: উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূলের গড় ভাঙতে হলে ‘SIR’ ইস্যুকে এক চূড়ান্ত গণ-আন্দোলনে রূপ দিতে হবে বিজেপিকে।
বাম-কংগ্রেস ও ‘ভোট-অঙ্ক’
মজার বিষয় হল, রাজপথে সবচেয়ে বেশি সরব বামপন্থীরা। তরুণ বাম নেতাদের আইনি লড়াই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনে নতুন আশা জাগিয়েছে। বামেরা যদি এই ক্ষোভকে ১০-১৫% ভোটে রূপান্তর করতে পারে, তবে তার সরাসরি ক্ষতি হবে তৃণমূলের। কারণ শাসক দলের অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ভোটগুলো তখন বিজেপির বদলে বামেদের ঝুড়িতে যাবে।
কার পাল্লা ভারী?
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে লড়াই কিন্তু কাঁটায় কাঁটায়। তৃণমূলের হাতে আছে ‘মাটি আর মানুষ’ এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ সংগঠন। অন্যদিকে বিজেপির হাতে আছে বিপুল অর্থবল, কেন্দ্রীয় এজেন্সি আর হিরেন যোশীর মতো তুখোড় ডিজিটাল চাণক্য, যিনি ‘SIR’ কেলেঙ্কারি আর ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে বাংলার প্রতিটি স্মার্টফোনে এক বিভীষিকা হিসেবে গেঁথে দিচ্ছেন।
কোনও সন্দেহ নেই, ২০২৬-এর ভোট হবে ‘জীবন-মরণ’ যুদ্ধ। যদি তৃণমূল এই দুর্নীতির কালি আর ভোটার তালিকার বিতর্ক ধুয়ে ফেলতে না পারে, তবে হিরেন যোশীর সাজানো এই ডিজিটাল মায়া নবান্নের দখল কেড়ে নিতে পারে। বাংলা এখন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, যার লাভার নাম ‘চাকরি চুরি’ আর ‘ভোটাধিকারের লড়াই’।
