
সোশাল মিডিয়ায় নরেন্দ্র মোদির এক একটি পোস্ট মানেই ঝড়ের গতিতে ভাইরাল। কখনও সর্দার প্যাটেলের মূর্তি, কখনও ‘চায়ে পে চর্চা’, আবার কখনও ২০৪৭-এর উন্নত ভারতের স্বপ্ন— এই সবকিছুর নেপথ্যে কাজ করে একটি ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। তিনি প্রশান্ত কিশোর নন, তিনি হিরেন যোশী। দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে যাঁকে ডাকা হয় প্রধানমন্ত্রীর ইকোসিস্টেমের ‘মাদারবোর্ড’ বা ‘সুপার এডিটর’ নামে।
কে এই হিরেন যোশী?
হিরেন যোশী কোনও সাধারণ আইটি সেল কর্মী নন। তিনি মোদির ডিজিটাল সাম্রাজ্যের আর্কিটেক্ট। গুজরাতের এক কলেজের ইলেকট্রনিক্সের অধ্যাপক থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অন্দরমহলে প্রবেশ, তাঁর এই উত্থান রূপকথার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। ২০০৮ সালে মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী, তখন থেকেই হিরেন তাঁর ছায়াসঙ্গী। টেকনোলজিকে কীভাবে রাজনীতির হাতিয়ার করতে হয়, হিরেন তা জানতেন সবার আগে।
কেন তাঁকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলা হয়?
হিরেন যোশীর কাজের স্টাইল একেবারেই কর্পোরেট এবং স্মার্ট। মোদিকে কখন বিশ্বনেতা হিসেবে তুলে ধরতে হবে আর কখন সাধারণ মানুষের ঘরের লোক— পুরো স্ক্রিপ্ট লেখেন হিরেন। সোশাল মিডিয়ায় কোন খবর ট্রেন্ড করবে আর কোনটা তলিয়ে যাবে, তার রিমোট কন্ট্রোল থাকে হিরেনের হাতেই। বড় বড় নিউজ চ্যানেলের এডিটরদের কাছেও তাঁর নির্দেশ পৌঁছয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। রেডিয়োর অনুষ্ঠানকে কীভাবে ডিজিটালি পপুলার করতে হয়, হিরেন তা হাতে কলমে দেখিয়েছেন। ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক হলোগ্রাম প্রচারের ব্লু-প্রিন্ট ছিল তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
পিকের উত্তরসূরি না কি ভিন্ন কেউ?
এক সময় প্রশান্ত কিশোর ছিলেন মোদির ডান হাত। কিন্তু অমিত শাহের সঙ্গে সংঘাতের জেরে পিকে বিদায় নেন। হিরেন যোশী কিন্তু গত এক দশক ধরে টিকে আছেন একদম নিঃশব্দে। তিনি ক্যামেরার সামনে আসেন না, সাক্ষাৎকার দেন না। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। রাজনীতির ময়দানে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, পিকের মতো হিরেনের ডানা কি কখনও ছেঁটে দেবেন মোদি? ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া নিয়ে হিরেনকে নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ওঠে। বিরোধীদের ডিজিটাল প্রচারের ঝড়ে কি তবে হিরেনের টিম কিছুটা পিছিয়ে পড়ে? এই প্রশ্নটাই ল্যুটিয়েন্স দিল্লির সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় দীর্ঘদিন ধরে।
ভবিষ্যৎ কী?
রাজনীতি এখন আর শুধু ময়দানের লড়াই নয়, এটা এখন ডেটা আর অ্যালগরিদমের খেলা। ২০৪৭-এর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে মোদির ডিজিটাল টিমকে আরও স্মার্ট হতে হবে। হিরেন যোশীকে সরানো মোদির পক্ষে সহজ হবে না, কারণ ডিজিটাল দুনিয়ায় মোদি ব্র্যান্ডের নির্মাতা তিনিই। হিরেন যোশী কি পারবেন আবার সেই ম্যাজিক ফিরিয়ে আনতে? না কি নতুন কোনও কৌশলবিদের আগমনের সময় হয়েছে? সময় এর উত্তর দেবে, তবে বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে হিরেন যোশী এক রহস্যময় এবং পাওয়ারফুল নাম।
২৬-এর বাংলা ও আগামীর রণকৌশল
ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র থাকে, যারা কখনও ফ্রেমের সামনে আসে না, অথচ পুরো সিনেমাটা তাদের ইশারায় চলে। নরেন্দ্র মোদির সেই ‘অদৃশ্য হিরো’র নাম হিরেন যোশী। ডিজিটাল দুনিয়ায় মোদিকে ‘অজেয়’ করে তোলার কারিগর এই মানুষটিই দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে সবথেকে চর্চিত নাম। রাজদীপ সারদেশাইয়ের মতো দুঁদে সাংবাদিকরা তাঁকে ডাকেন ‘সুপার এডিটর’ নামে। কেন? কারণ তিনি কেবল পোস্ট করেন না, তিনি দেশের খবরের গতিপথ ঠিক করেন। সকালে কোন খবরটা ভাইরাল হবে আর রাতে কোন বিষয় নিয়ে টিভি চ্যানেলে ডিবেট হবে, তার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয় হিরেনের ডেস্কে। সরকারের বিরুদ্ধে কোনও নেতিবাচক হাওয়া বইলে মুহূর্তের মধ্যে পালটা ইস্যু তৈরি করে মানুষের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়ায় তিনি সিদ্ধহস্ত।
২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হিরেন যোশী হতে চলেছেন বিজেপির অন্যতম তুরুপের তাস। বঙ্গ-সমরে তাঁর রণকৌশল হতে পারে ঠিক এইরকম:
বাংলায় ডিজিটাল ওয়ার রুম
ইতিমধ্যে বিজেপি বাংলায় অঞ্চলভিত্তিক ডিজিটাল ‘ওয়ার রুম’ তৈরি করে ফেলেছে। হিরেনের নেতৃত্বে এই ওয়ার রুমগুলো সরাসরি পিএমও-র নির্দেশে কাজ করবে।
পরিযায়ী ভোটারের নাগাল
হিরেনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল অন্য রাজ্যে থাকা পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাবিত করা। যাতে তাঁরা ভোটের সময় বাড়ি ফিরে বিজেপির পক্ষে বোতাম টেপেন।
আঞ্চলিক ন্যারেটিভ
বাংলার মানুষের আবেগকে ছোঁয়ার জন্য হিরেনের টিম এবার আরও বেশি স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর জোর দিয়েছে। স্থানীয় উৎসবগুলোতে ডিজিটাল প্রচারের সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যাচ্ছে তাঁরই নির্দেশে।
অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ও ড্যামেজ কন্ট্রোল
বাংলার শাসক দলের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে এবং বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা ‘বহিরাগত’ তকমা মুছতে হিরেন যোশী তাঁর ডিজিটাল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে হিরেন যোশীর ডিজিটাল টিম বাংলার প্রতিটি স্মার্টফোনকে এক একটি ‘মিনি ব্যালট বক্স’ হিসেবে দেখছে। দিল্লির পিএমও থেকে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত এই ডিজিটাল ওয়ার রুমের রণকৌশল এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ এবং ‘লোকালাইজড’।
‘সোনার বাংলা ২.০’ ও হ্যাশট্যাগ গেম
হিরেন যোশীর ফর্মুলায় এবার কেবল উন্নয়ন নয়, বরং ‘আবেগ’ আর ‘অস্মিতা’কে হাতিয়ার করা হচ্ছে।
AmarBanglaModirSathe: এই হ্যাশট্যাগটি দিয়ে গত কয়েক মাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হল, মোদি যে ‘বহিরাগত’ নন, বরং বাংলার উন্নয়নের প্রকৃত বন্ধু, তা প্রমাণ করা।
SonurBangla2026: ২০২১-এর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার হিরেন ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নকে আরও ডিজিটাল ও আধুনিক রূপে পরিবেশন করছেন।
হাইপার-লোকাল কন্টেন্ট
হিরেন যোশী বিশ্বাস করেন, কলকাতায় বসে করা প্রচার কোচবিহার বা ঝাড়গ্রামে কাজ করবে না। তাই তাঁর স্ট্র্যাটেজিতে রয়েছে:
আঞ্চলিক উপভাষা: বাঁকুড়া বা বীরভূমের জন্য স্থানীয় উপভাষায় মোদির বার্তাকে ডাবিং করা হচ্ছে। ছোট ছোট ৩০ সেকেন্ডের ‘রিলস’ তৈরি করা হচ্ছে যা সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
পকেট-ওয়ার রুম: বাংলার ২৯৪টি কেন্দ্রের জন্য আলাদা আলাদা ডিজিটাল ভলান্টিয়ার টিম তৈরি করেছেন হিরেন। এই টিমগুলোর কাজ হল স্থানীয় ছোট ছোট সমস্যাকে বড় ইস্যু বানিয়ে সোশাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড করানো।
‘মোদি কি গ্যারান্টি’ বনাম ‘দিদির প্রকল্প’
বাংলার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনপ্রিয় প্রকল্পের পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরিতে হিরেন যোশী অত্যন্ত সূক্ষ্ম চাল চালছেন।
তুলনামূলক গ্রাফিক্স: কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা আর রাজ্য প্রকল্পের ত্রুটি নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ ‘ইনফোগ্রাফিক্স’ শেয়ার করা হচ্ছে।
সরাসরি সংযোগ: ‘মন কি বাত’-এর আদলে বাংলার তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে মোদির ভার্চুয়াল আলাপচারিতার বিশেষ সেশন প্ল্যান করছেন হিরেন, যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে মোদিকে সরাসরি বাংলার মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেওয়া হবে।
ফেক নিউজ ও ন্যারেটিভ কন্ট্রোল
হিরেন যোশীর টিমের সবচেয়ে বড় শক্তি হল ‘রিয়েল-টাইম রেসপন্স’। বিরোধীরা কোনও ইস্যু তোলার ১০ মিনিটের মধ্যেই পাল্টা ভিডিয়ো বা মিম তৈরি করে সেই ন্যারেটিভকে ভোঁতা করে দেওয়ায় হিরেনের টিম সিদ্ধহস্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে মোদির ভাষণকে বাংলা ভাষায় এমনভাবে রূপান্তর করা হচ্ছে যে মনে হবে তিনি নিজেই সাবলীল বাংলায় কথা বলছেন।
২০২৬-এর লক্ষ্য: ‘মোদি ইন বেঙ্গলি হার্ট’
হিরেন যোশীর আসল লক্ষ্য হল মোদিকে একজন ‘বিশ্বনেতা’ থেকে ‘বাংলার আপনজন’ হিসেবে রি-ব্র্যান্ডিং করা। শান্তিনিকেতনের সংস্কৃতি থেকে শুরু করে গঙ্গাসাগর মেলা— সবকিছুকে মোদির ডিজিটাল প্রোফাইলে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং হচ্ছে যাতে বাঙালির মনে মোদির প্রতি কোনও দূরত্ব না থাকে। দোরগোড়ায় ভোট। খুব গুরুত্বপূর্ণ। শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি দুর্নীতির অভিযোগ। পাল্টা SIR নিয়ে ময়দানে মমতা। সাধারণ মানুষেরহ ভোগান্তি, নাম বাদ নিয়ে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে একাসনে বসিয়ে বুলডোজার চালাচ্ছেন মমতা-অভিষেক। লড়াই-পাল্টা লড়াই জমজমাট। বিজেপিকে ক্ষমতায় আসতে হলে হিরন যোশীর ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে। কারণ, রাজনীতিতেও এই মুহূর্তে সোশাল মিডিয়া অন্যতম বড় শক্তি। সেই ময়দানে হিরেনের তুলনা নেই। তাই ২০২৬-এর বাংলা নির্বাচন হিরেন যোশীর জন্য অগ্নিপরীক্ষা। প্রযুক্তির এই বিশাল জাল কি পারবে বাংলার মানুষের মন জয় করতে? হিরেনের অ্যালগরিদম কি ঘাসফুলের শিকড় উপড়ে পদ্ম ফোটাতে পারবে? এই ডিজিটাল মহাযুদ্ধের ফলাফল জানতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
