
দিব্যেন্দু ঘোষ
মধ্যপ্রাচ্য আজ এক বারুদের স্তূপ। ইরান, ইজরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যে এই ত্রিমুখী উত্তেজনা কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, এর আঁচ সরাসরি এসে লেগেছে ভারতের আমজনতার হেঁশেলে। রান্নার গ্যাসের দাম একলাফে ৬০ টাকা বাড়া সেই সঙ্কটেরই একটি প্রাথমিক সঙ্কেত মাত্র।
ভারত কেন সঙ্কটে?
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি একটি ডবল-এজড সোর্ড বা দুধারী তলোয়ারের মতো। এর কারণ মূলত তিনটি:
জ্বালানির হাহাকার: ভারতের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮৫% আমদানিনির্ভর। যদি ইরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে ভারতের তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়বে। এমনিতেই ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, চিন ছাড়া অন্য দেশের জাহাজ হরমুজে ঢুকলে উড়িয়ে দেবে। চাপ বাড়ছে ভারতের। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে ভারতে পেট্রোল-ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি একলাফে আকাশে গিয়ে ঠেকবে। ভারতের ৮০-৮৫% এলপিজি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ বন্ধ হওয়া মানে স্বাভাবিকভাবেই ভারতে রান্নার গ্যাসের তীব্র আকাল এবং আকাশছোঁয়া দাম।
সংবেদনশীল স্নায়ুকেন্দ্র
বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতির মানচিত্রে হরমুজ প্রণালী হল সবথেকে সংবেদনশীল একটি স্নায়ুকেন্দ্র। ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনার আবহে এই প্রণালীটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করছে।
এটি একটি অত্যন্ত সরু সমুদ্রপথ যা পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে যুক্ত করেছে। এর একদিকে রয়েছে ইরান এবং অন্যদিকে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। এটি প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা। এর সঙ্কীর্ণতম অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, যার মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত লেনটি মাত্র ৩ কিলোমিটার প্রশস্ত। ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব এবং কাতারের মতো দেশগুলোর সমুদ্রপথে বিশ্ববাজারে পৌঁছনোর এটাই একমাত্র রাস্তা।
কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ?
একে বলা হয় বিশ্বের এনার্জি লাইফলাইন বা জ্বালানির জীবনরেখা। বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০-২৫% এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এখান দিয়ে যায়।
ভারতের হরমুজ-নির্ভরতা
ভারতের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৫০-৬০% এবং এলপিজি-র একটা বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই আসে। যদি ইরান কোনও সামরিক উত্তেজনার জেরে এই প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্বজুড়ে মহাপ্রলয় নেমে আসতে পারে।
তেলের দামের বিস্ফোরণ: আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভারতসহ অনেক দেশে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হওয়া অসম্ভব নয়। তাই এই পথটি খোলা রাখতে আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে নামছে, যা পরিস্থিতিকে একটা বড় আকারের আন্তর্জাতিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি: পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে খাদ্যশস্য সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়বে। এটি বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনতে পারে।
বিদ্যুৎ সঙ্কট: অনেক দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলে এশিয়া ও ইউরোপে ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হতে পারে।
মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতীয় কর্মরত। যুদ্ধের কারণে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ভারত সরকারকে ‘অপারেশন অজয়’-এর মতো বিশাল উদ্ধারকাজ চালাতে হবে। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমে গেলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে বড় ধাক্কা লাগবে।
কৌশলগত স্বার্থ: ভারতের উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট চাবাহার বন্দর এবং IMEC (ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডর) আজ যুদ্ধের মেঘে ঢাকা। এই প্রকল্পগুলো সফল না হলে মধ্য এশিয়ায় ভারতের বাণিজ্য আধিপত্য চিনের দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মোদির ‘চাণক্য নীতি’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই অগ্নিপরীক্ষায় অত্যন্ত ধীরস্থির ও বুদ্ধিদীপ্ত ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ চালাচ্ছেন:
ডি-হাইফেনেশন কূটনীতি: ভারত আজ আর কোনও এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার পুরনো নীতিতে নেই। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অটুট রাখা, অন্যদিকে আমেরিকার চাপ উপেক্ষা করে ইরানের সঙ্গে চাবাহার বন্দর চুক্তি এগিয়ে নেওয়া— এই ভারসাম্যই মোদি সরকারের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। সম্প্রতি ইজরায়েল সফর করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। নেতানিয়াহুর সঙ্গে গলা জড়িয়ে মোদির উচ্ছ্বাস গোটা দুনিয়া দেখেছে। যুদ্ধের আবহে ইজরায়েলের সঙ্গে গলায় গলায় দোস্তি ভারতকে ইরানের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। সবটা জেনেও ঝুঁকি নিচ্ছেন মোদি।
জ্বালানি বাস্কেট বদল: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বুঝতে পেরে মোদি সরকার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। বর্তমানে ভারতের তেলের বড় অংশ আসছে রাশিয়া থেকে, যা পশ্চিমি দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সস্তায় কেনা হচ্ছে। এটাই ভারতের বাজারে তেলের দামকে বড় কোনও বিস্ফোরণ থেকে রক্ষা করছে।
ভর্তুকি ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা: এলপিজি-র দাম ৬০ টাকা বাড়লেও সরকার উজ্জ্বলা যোজনার মাধ্যমে গরিব পরিবারগুলোকে বাড়তি ভর্তুকি দিয়ে জনরোষ সামলানোর চেষ্টা করছে। নৌবাহিনী মোতায়েন করে বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও মোদির দূরদর্শী পদক্ষেপ।
ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুদ্ধের ব্যাপ্তির ওপর। যদি এটা সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে ভারতকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারত নিজেকে বিশ্বমঞ্চে ‘বিশ্ববন্ধু’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন এতটাই মজবুত যে, ভারত চাইলে ইরান ও পশ্চিমি দুনিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ১-১.৫% কমে যেতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। নরেন্দ্র মোদির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ‘দাবা’র বোর্ডে জয় ছিনিয়ে নেওয়া, আর অন্যদিকে ঘরোয়া বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। ভারত এখন আর কেবল দর্শক নয়, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। মোদি সরকারের ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতি যদি সফল হয়, তবে এই সঙ্কট থেকেই ভারত এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

