
দিব্যেন্দু ঘোষ
বাংলার দরজায় কড়া নাড়ছে ভোট। মার মার কাট কাট লড়াই। ভোটযুদ্ধের দামামা বাজছে। বিজেপির কাছে হয় এবার, নয় নেভার। একাধিক দুর্নীতিতে জেরবার তৃণমূল ক্রমশই নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। সংগঠনের হাল অভিষেকের হাতে। ভোট-ময়দানে আরও বেশি তত্পর। আরও বেশি ধারালো লাগছে মমতা-অভিষেক জোড়া ফলা। তবে এই মহাযুদ্ধের আগে বাংলার রাজনীতি এখন আর কেবল জনসভা বা মিছিলে সীমাবদ্ধ নেই, তা ঢুকে পড়েছে আমার আপনার ড্রয়িংরুমের টিভির পর্দায় আর হাতের স্মার্টফোনে। এটা এখন এক ভয়ঙ্কর ‘পারসেপশন গেম’। তথ্যের কচকচানি আর বিজ্ঞাপনের ঝকঝকে মোড়কে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে রুটি-রুজির আসল লড়াই।
বাংলার বিধানসভা ভোট মানেই কি শুধু দুই শিবিরের লড়াই? নাকি এটা আসলে দিল্লির কর্পোরেট স্টাইলের ‘ব্র্যান্ডিং’ বনাম বাংলার ‘অস্তিত্বের’ লড়াই?
পকেটমারি যখন ‘উপহার’
দিল্লি মুখে বলে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’, কিন্তু তলে তলে চলছে রাজ্যকে ভাতে মারার সূক্ষ্ম কারসাজি। কেন্দ্র এখন সরাসরি ট্যাক্স না বাড়িয়ে জোর দিচ্ছে ‘সেস’ এবং ‘সারচার্জ’-এর ওপর। কারণ কী? সাধারণ ট্যাক্সের টাকা রাজ্যগুলোকে ভাগ দিতে হয়, কিন্তু ‘সেস’-এর টাকার কোনও অংশ রাজ্য পায় না। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ সালেই এই সেস মোট করের ২০.২% ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাজনীতির কারবারিদের একাংশের মত, আপনার দেওয়া তেলের ট্যাক্স বা ইনকাম ট্যাক্সের সেসের কানাকড়িও বাংলার উন্নয়নে খরচ হয় না। সেই টাকা দিয়ে দিল্লিতে তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞাপনী মায়া। তৃণমূলের তো সেই কবে থেকেই অভিযোগ, দিল্লি যখন নিজের সিন্দুক ভরাট করছে, তখন বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে রেখে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমাধি দিচ্ছে। এটা কি উন্নয়ন, নাকি পরিকল্পিত বঞ্চনা?
নামী ব্র্যান্ডের স্টিকার
গত দশকে গ্রামীণ ভারতের উন্নয়নে রাজ্যগুলোর সক্রিয়তা বেড়েছে আকাশছোঁয়া। তথ্য বলছে, কেন্দ্রের তুলনায় রাজ্যগুলোর সামাজিক ব্যয় এখন প্রায় ৮ গুণ বেশি! ইউপিএ আমলে সামাজিক খাতে বাজেটের বরাদ্দ যেখানে ছিল ৮.৫%, বর্তমানে তা কমতে কমতে ঠেকেছে মাত্র ৫.৩%-এ। কিন্তু মজার কথা হল, বরাদ্দ কমলেও বিজ্ঞাপনের বাজেট বেড়েছে রকেট গতিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘স্বাস্থ্যসাথী’র মতো প্রকল্পগুলো যখন সরাসরি মানুষের উপকারে আসছে, তখন দিল্লি ‘পিআর এজেন্সি’ নামিয়ে প্রচার করছে যে সবটাই তাদের ‘গ্যারান্টি’। মাঠে কাজ করছে রাজ্য সরকার, আর সেই কাজের ওপর নিজের স্টিকার মেরে ‘ক্রেডিট’ চুরির অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে। তৃণমূলের প্রচারে এই নিয়েই ঝড়।
ভাতে মারার রাজনীতি!
২০২২ সাল থেকে বাংলার গরিব মানুষের পাওনা টাকা আটকে রাখা হয়েছে স্রেফ ‘টেকনিক্যাল’ দোহাই দিয়ে। মনরেগা এবং আবাস যোজনার বকেয়া লায়াবিলিটি এখন ৩,০৮২ কোটি টাকা পার করেছে। শ্রমের মজুরি আর মাথার ছাদ আটকে রেখে কি বাংলার মানুষকে রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করাতে চাইছে দিল্লি? ছাব্বিশের নির্বাচনে এই ‘আর্থিক অবরোধ’ বুমেরাং হয়ে দিল্লির দিকেই ফিরে আসবে না তো? গরিবের পেটে লাথি মেরে জেতার এই ফর্মুলা আর কতদিন?
পকেট খালি, ভাষণ ভারী
ইউপিএ জমানায় মাথাপিছু সামাজিক খরচ বৃদ্ধির হার ছিল ৩৯৭%, যা বর্তমান জমানায় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৬%-এ। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া, গ্যাসের দাম হাজার পার, অথচ প্রচার হচ্ছে ‘বিনামূল্যে রেশন’-এর। রেশনে যা দিচ্ছে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা কেন্দ্র আপনার পকেট থেকে কেটে নিচ্ছে সেস আর ভ্যাট-এর মাধ্যমে। লিটার প্রতি তেলে বা গ্যাসে আপনার পকেট থেকে যে বাড়তি টাকাটা বেরিয়ে যাচ্ছে, তার কোনও হিসেব কি বিজ্ঞাপনে থাকে? এটি আসলে ‘রবিন হুড’ রাজনীতির উলটপুরাণ, গরিবের পকেট কেটে কর্পোরেট বিজ্ঞাপনী প্রচার চালানো।
বাংলার স্বাধিকার
দিল্লির এই তীব্র কেন্দ্রীয়করণ কি ভারতকে এক অদ্ভুত সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে? কেন্দ্র কি চাইছে পশ্চিমবঙ্গকে স্রেফ একটি ‘মিউনিসিপ্যালিটি’তে পরিণত করতে? সব ক্ষমতা দিল্লির হাতে, সব টাকা দিল্লির সিন্দুকে, আর সব কাজের কৃতিত্বও দিল্লির, এই মডেল ফেডারেলিজমের জন্য এক অশনি সঙ্কেত।
শেষ কথা
আপনি কি কেবল মোড়ক দেখবেন? ছাব্বিশের ভোট স্রেফ সরকার গড়ার ভোট নয়, এটি নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই। যখন কাজের কৃতিত্ব ৮ গুণ বেশি হয়েও স্রেফ প্রচারের অভাবে রাজ্য পিছিয়ে পড়ে, তখন ভোটারদের দায়িত্ব হোর্ডিংয়ের চাকচিক্য সরিয়ে আসল অঙ্কটা বোঝা। কোনও বিশেষ বিজ্ঞাপন নয়, নিজের পকেটের অবস্থা আর নিজের ঘরের ছাদটাই হোক এবারের ভোটের আসল মাপকাঠি। দিল্লির চকচকে মোড়ক কি পারবে বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনাকে আড়াল করতে? উত্তর পেতে আর দুটো মাস।

