
রাজনীতিতে অভিযোগ ছোড়াছুড়ি লেগেই থাকে। ভোটের বাংলায় রাজনৈতিক দলগুলির কুটনৈতিক কৌশলও কিছু কম ব্যবহার হচ্ছে না। শাসক দল অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেস আর রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল অর্থাৎ বিজেপির মধ্যেও তা চলছে। সমাজমাধ্যমে প্রায় দিন কোনও ভিডিয়ো বা কিছু খবর পোস্ট করে একে অপরের বিরুদ্ধে তারা প্রচার চালায়। এবার একে অপরের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রকাশ করে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছে তৃণমূল-বিজেপি।

বঙ্গ সফরে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শনিবার ৩৫ পাতার অভিযোগনামা প্রকাশ করেছিলেন। তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের পাল্টা ১৩ দফার ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করে ভোটের বাংলায় রাজনৈতিক উত্তাপকে আর একটু বাড়িয়ে দিয়েছে।

অমিত শাহ তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে খতিয়ান তুলে ধরেছিলেন, তৃণমূল তার পাল্টা জবাব দিয়েছে অত্যন্ত কৌশলীভাবে। তৃণমূলের অভিযোগ, শাহের এই চার্জশিট আসলে বাংলার আপামর জনগণের বিরুদ্ধে। তৃণমূল একপ্রকার তাছিল্যের সুরে বিজেপিকে নিশানা করে বলেছে, “নিজের ঘর সামলান, তারপর অন্যকে জ্ঞান দিন।”
তৃণমূলের চার্জশিটে জাতীয় স্তরের একাধিক জ্বলন্ত ইস্যুকে হাতিয়ার করা হয়েছে। মণিপুরের জাতিদাঙ্গা থেকে শুরু করে পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলা কিংবা দিল্লির সুরক্ষা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতাকে কাঠগড়ায় তুলেছে শাসকদল। বিশেষ করে নারী সুরক্ষা ও তফশিলি জাতির ওপর অত্যাচারের পরিসংখ্যান দিয়ে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থানের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর সঙ্গে কলকাতার তুলনা টানা হয়েছে। এনসিআরবি-র তথ্য উল্লেখ করে কলকাতাকে দেশের “সবচেয়ে নিরাপদ শহর” হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি ফের উল্লেখ করেছে তৃণমূল।

বেকারত্ব এবং কৃষক আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলো ভারতের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির এক করুণ চিত্র। তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, গত ৪৫ বছরে দেশে বেকারত্ব সর্বোচ্চ এবং ২০১৪ সাল থেকে ১০ লক্ষেরও বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানগুলো দিয়ে বিজেপি-র ‘বিকাশ’-এর তত্ত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে বলে দাবি করছে ওয়াকিবহাল মহল। এছাড়া, সিএএ-এনআরসি বা এসআইআর-এর মতো বিষয়গুলো ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মনে নাগরিকত্ব হারানোর যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাকেও রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে তৃণমূল।

দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ তৃণমূলের দিকে যখন শাহ আঙুল তুলেছেন, তৃণমূলও তখন বিজেপি-র ‘ওয়াশিং মেশিন’ তত্ত্বকে সামনে এনেছে। শুভেন্দু অধিকারী থেকে হিমন্ত বিশ্বশর্মা- বিরোধী শিবিরের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বিজেপি-তে যোগদানের পর ‘ক্লিনচিট’ পাওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেছে। কয়লা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর সঙ্গে শাহের ছবি প্রকাশ করে বিজেপি তীব্র আক্রমণ করেছে শাসকদল।

বাংলার রাজনীতিতে ‘বঞ্চনা’ এবং ‘আবেগ’ সবসময়ই বড় ভূমিকা পালন করে। একদিকে সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকার কর আদায় করে পাওনা টাকা না দেওয়ার অর্থনৈতিক অভিযোগ, অন্যদিকে বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথের মতো মণীষীদের অপমানের অভিযোগ তুলে তৃণমূল আসলে বাঙালির আত্মসম্মানে শান দিতে চাইছে।

এই চার্জশীটের যুদ্ধের একটাই মূল লক্ষ্য- সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের সঠিক প্রমাণ করা যাতে তা নির্বাচনে সাহায্য করতে পারে।

গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য সাধারণ মানুষদের আরও সক্রিয় হতে হবে। ভোট এলেই শাসক-বিরোধী লড়াই শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর পাঁচটা বছর সবটা ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে। রাজনৈতিক দলগুলি একে অপরের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ পেশ করাতে তাদের যুদ্ধে জয় পেতে কতটা সাহায্য করতে পারে তা সাধারণ মানুষ বিবেচনা করুক। আর সিংহাসন কার হবে সেটা বলবে নির্বাচনের ফলাফল।
