
ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের পতন। কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলের প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের শেষ প্রতিনিধিকেও হারাল হয়তো দেশ। লতা মঙ্গেশকর, মুকেশ, মহম্মদ রফি এবং কিশোর কুমারের মতো প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের সঙ্গে মিলে তিনি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সঙ্গীতের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেছিলেন। এই কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে তাঁর চলে যাওয়া কার্যত একটি কালজয়ী অধ্যায়ের ওপর যবনিকা টেনে দিল।
১৯৪৩ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে আশার সঙ্গীত জীবনের যাত্রা শুরু। ততদিনে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছেন। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত আশাকে মূলত ‘লতার বোন’ হিসেবেই চিনেছে জগত। মেধার কোনও অভাব না থাকলেও, শুরুতে তাঁর জন্য বরাদ্দ থাকতো মূলত ক্যাবারে বা নাচের গান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত পরিচালকরা এই কনিষ্ঠ মঙ্গেশকর কন্যার ওপর ভরসা রাখতে শুরু করেন এবং আশা তাঁদের বিশ্বাসের পূর্ণ মর্যাদা দেন।
‘কারাভান’-এর ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘ডন’-এর ‘ইয়ে মেরা দিল’, ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণা’-র ‘দম মারো দম’ কিংবা ‘তিসরি মঞ্জিল’-এর ‘ও হাসিনা জুলফঁ ওয়ালি’— দশকের পর দশক ধরে বলিউডের যেকোনো নাচের গান মানেই ছিল আশা ভোঁসলের কণ্ঠ। ষাট বা সত্তরের দশকে পর্দায় হেলেন থাকা মানেই নেপথ্যে আশার জাদুকরী উপস্থিতি। এই ঘরানাটিই তাঁর সিগনেচার স্টাইলে পরিণত হয়েছিল।
আশির দশক পর্যন্ত অনেকেই মনে করতেন আশা হয়তো কেবল দ্রুত লয়ের গানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সেই ধারণা চুরমার হয়ে যায় ‘উমরাও জান’ ছবির গজলগুলোর মাধ্যমে। দক্ষতা ও মাধুর্যের সঙ্গে গজল গেয়ে তিনি নিজের প্রথম জাতীয় পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পর ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ গানের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি কেবল ‘লতার বোন’ নন, বরং স্বমহিমায় ভাস্বর এক মহান শিল্পী। এই গানের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।
সঙ্গীতের মতো ব্যক্তিগত জীবনেও আশা সবসময় প্রচলিত প্রথার বাইরে হেঁটেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে গিয়ে ৩১ বছর বয়সি গণপত রাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেছিলেন। সেই দাম্পত্য সুখের না হলেও তিনি ‘ভোঁসলে’ পদবিটি সারাজীবন আঁকড়ে ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে যখন তিনি আর.ডি বর্মণকে বিয়ে করেন, তখনও সামাজিক বা পারিবারিক বাধা তাঁকে দমাতে পারেনি।
গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী বিশ্বের সবথেকে বেশি গান রেকর্ড করা এই শিল্পীর প্রয়াণ কেবল একজন গায়িকার বিদায় নয়, বরং একটি অবিনশ্বর সংস্কৃতির শেষ প্রদীপের নির্বাপণ। ভারতীয় সঙ্গীতাকাশে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা গোটা দেশবাসীকে শোকাতুর বানিয়ে তুলেছে।
