হাসিনা সরকার ক্ষমতার হারানোর পর একের পর এক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের কাছাকাছি চলে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্য পরিবর্তন করছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। দুই দেশের বন্ধুত্ব থেকে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। হাসিনার ক্ষমতা থেকে উৎখাতের পর ভারতের প্রভাব থেকে ক্রমাগত নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। আর এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে ভারতের। আগামী সময়ে পাকিস্তান ও চীনের নৈকট্যের কারণে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ায় দেখা যাবে।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিফ মালিক বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন। আইএসআই প্রধানের সফর থেকে অনেক কিছুই অনুমান করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল এস এম কামরুল হাসান ১৪ জানুয়ারি পাকিস্তান সফর করেন। কামারুল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। দুই দেশের মধ্যে কিছু প্রতিরক্ষা চুক্তি হতে পারে বলে জল্পনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে এটা ভারতের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পাকিস্তান থেকে আসা মানুষের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি দুই দেশই বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে অগ্রাধিকার দিয়েছে। মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক মোটেই সন্তোষজনক ছিল না।
তাতে পাকিস্তানের কী লাভ?
দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হলে পাকিস্তান অবশ্যই উপকৃত হবে। ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে বাংলাদেশে জমি পাবে পাকিস্তান। এ ছাড়া ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ পাকিস্তানের জন্য একটি বড় বাজার হতে পারে, যার সুবিধা তারা নিতে পারে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সুযোগ দেখছেন তিনি। ২০২৩-২৪ সালে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য হবে ৭১৮ মিলিয়ন ডলার।
গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালের সমস্যা ‘একবার ও সবের জন্য’ সমাধান করতে বলেছিল। এর পেছনে যুক্তি ছিল ঢাকাকে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করা। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস শরীফকে ১৯৭১ সালের সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান, যাতে ঢাকা ইসলামাবাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে পারে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় শিবিরে বন্দী পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তন এবং উভয় দেশে আটকে পড়া মানুষদের পুনর্বাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলিও ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। ওই ভূখণ্ড তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পরিচিত ছিল।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ভারতের জন্যও উদ্বেগের কারণ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ক্ষোভের জেরে গত বছরের আগস্টে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে। এর পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশে মৌলবাদী শক্তি শক্তি পেয়েছে। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী তৎপরতা জোরদার হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের ধর্মীয় স্থানগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ আনা হচ্ছে। বাংলাদেশে ভারতের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করছে বলে খবর আছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে JF-১৭ কেনার কথা ভাবছে। এর আগে জানা যায় বাংলাদেশ চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনছে। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে আগামী দিনে বাংলাদেশে হিজবুল, লস্কর-ই-তৈয়বা, জামাত-উল-মুজাহিদিনের মতো সংগঠনের তৎপরতা বাড়তে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও এর প্রভাব দেখা দেবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পিকে সেহগালের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এর কারণ চীন ও পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বে আবার অশান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের অবস্থা খুবই নাজুক। হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে আমেরিকার গভীর রাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র। সম্প্রতি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে ভারত যেভাবে অবস্থান নিয়েছে তাতে বাংলাদেশের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
