অভিজিৎ বসু
আসলে ছাতি যত ৫৬ ইঞ্চি মাপের হোক নিজের কলেজের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকার আওয়াজ যতই তুলুন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই তাঁকেও কিন্তু চলতি মাসের ৩০ তারিখ নাগপুর আরএসএস এর মুখ্য কার্যালয়ে য্যেতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম আরএসএস মুখ্য কার্যালয়ে যাবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেশের এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী আরএসএস হেডকোয়ার্টার এ যাবেন। দেখা করবেন আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত এর সাথে। আর এটা নিয়েই হৈ চৈ হুল্লোড় পড়ে গেছে চারিদিকে। নাগপুরে আরএসএস এর সদর কার্যালয় কেশব কুঞ্জে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই প্রথম দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী আরএসএস এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাচ্ছেন।সর্বোপরি নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম যাচ্ছেন আরএসএস কার্যালয়ে। চলতি মাসের ৩০ তারিখ মুখোমুখি হবেন মোদী ও ভগবত। নাগপুরের রেশমিবাগে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সদর দফতর কেশব কুঞ্জ। আর এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদী কেশব কুঞ্জে পা রাখবেন। এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী কেশব কুঞ্জে যাচ্ছেন। এর আগে
কোনো প্রধানমন্ত্রী আরএসএস কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান নি। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন গত ১১ বছরে এই প্রথম মোদী কেশব কুঞ্জে যাচ্ছেন। নাগপুরের ভূমিপুত্র আরএসএস এর দ্বিতীয় স্বর সংঘ চালক মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার এর নামাঙ্কিত একটি চোখের হাসপাতালের সম্প্রসারণের শিলান্যাস করতে যাবেন মোদী।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বিজেপির তথা প্রথম এন ডি এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অটল বিহারী বাজপেয়ি ও কোনোদিন আরএসএস এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাননি। আর সেটা নিয়েই এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একে বলে ঠেলায় পড়লে হাতিকেও নড়ে চড়ে বসতে হয়। যে হাতি নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করেই বেঁচে থাকে কখনও কখনও সেই বিশাল আকৃতির জীবকেও কেন জানিনা একটু মাথা নিচু করে চলতে হয়। কিছুটা নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে হুংকার না ছেড়ে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর এখন ঠিক সেই অবস্থা। একে চলতি বছরের শেষেই বিহার বিধানসভার নির্বাচন। আর তারপরেই ২০২৬ সালে মাথার ওপর বাজছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও তামিলনাড়ুর নির্বাচন। সেই নির্বাচন এর আগেই মোদী আর মোহন ভাগবত এর বৈঠক। মোদীর চলে যাওয়া আর এস এস এর সদর দফতরে। এছাড়াও সেই নাগপুরে ঔরঙ্গজেব এর সমাধি নিয়ে যে উত্তেজনার ঘটনায় ঘটেছিল তারপর এই প্রথম মোদী নাগপুর যাচ্ছেন। কারণ তিনি স্পষ্ট ভাবেই তাঁর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন যে,
আমি স্বয়ং সেবক হিসেবে জীবনের আসল রূপ জেনেছি। যে কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাহলে কি এই ছাপান্ন ইঞ্চি মাপের ছাতি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই করুণ অবস্থা। ঠিক যেনো গরু হারালে এমন হয় যেনো। নিজের ওপর আস্থা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। আর তাঁর ওপর ভরসা করতে পারছেন না দিল্লির রাজধানী সেই নাগপুরের আর এস এস এর সদর দফতরের কেশবকুঞ্জের কর্তারা। আর তাই তাঁকে সেলাম ঠুকতে যেতে হচ্ছে চার রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে। তাহলে কী মোদি ম্যাজিক নিয়ে কিছুটা হলেও সন্দেহ দানা বেঁধেছে সংঘের অভ্যন্তরে। আর যে কারণে মোদীকে সেই সন্দেহ দূর করতেই তাঁর এই নাগপুর সফর।
২০০৪ সালে বিজেপি ইন্ডিয়া সাইনিং শ্লোগান দিয়ে দ্বিতীয় এনডিএ সরকার গঠনে ভোটে নামে। রাজনাথ সিংহ তখন সভাপতি। বাজপেয়ির বদলে বিজেপি নেতৃত্ব বিদায়ী উপ প্রধানমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদবানিকে মুখ করে প্রচার শুরু করে। আদবানিকে নিয়ে আর এস এসের আপত্তি পাত্তা না দিয়ে ভোটে লড়তে গিয়ে কী পরিণতি হয়, তা বহুচর্চিত ইন্ডিয়া সাইনিং মুখ থুবড়ে পড়ার পর টের পায় বিজেপি। ২০০৪ সালে সঙ্ঘ হাত গুটিয়ে বসে থাকায় কী ঘটেছিল, তা নাড্ডা, মোদি, শাহদের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তারপর এক দশক অপেক্ষায় থাকতে হয় গেরুয়া শিবিরকে। ২০২৪ সালের অষ্টাদশ লোকসভা ভোটের আগে থেকেই সঙ্ঘ প্রধান নানা অছিলায় মোদি সরকার তথা বিজেপির প্রতি সতর্ক বার্তা দিয়েছিলেন। নীরবে হলেও সঙ্ঘের সঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বের ঠোকাঠুকি ক্রমে বেড়ে চলছিল। জগৎ প্রসাদ নাড্ডা তো গত লোকসভা ভোটের মুখেই বলে বসলেন, আরএসএসের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, বিজেপি নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখে গিয়েছে। ভগবৎ তাঁর একাধিক ভাষণে বলেন, অহংকার বা ঔদ্ধত্য পতন ডেকে আনে। কোনও নিৰ্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের নাম না করে এমনই হুঁশিয়ারি দেন তিনি। আর ভোটে ‘চারশো পার ‘ হুঙ্কার দিয়ে শেষ পর্যন্ত বিজেপিকে ২৪০-এ থামতে হয়েছে।
নাড্ডার মেয়াদ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সভাপতি বাছাইয়ে নাগপুরের মতামত উপেক্ষা করার সাহস দেখাতে পারবে না বিজেপি নেতৃত্ব। সেকথাও জানেন দীনদয়াল মার্গের বর্তমান ক্ষমতাসীনরা। আর তাই সবদিক সামাল দিতে আসরে নামতে হয়েছে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। তাই কোনোও লড়াই বা হুংকার নয় একদম আপোষ এর পথকেই বেছে নিলেন সেই দেশের সেরা উজ্জ্বল ৫৬ ইঞ্চি মাপের ছাতির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এখন দেখার বিষয় এটাই যে এই ভাবে সংঘকে বাগে আনতে পারেন কিনা সেই জীবনের আসল রূপ জানতে পারা মোদী। যা তিনি সংঘের কাছ থেকেই জানতে পেরেছেন বলে নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন তিনি।
