সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
“কুকথায় পঞ্চমুখ দ্বন্দ্ব অহর্নিশ”। কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রূপক অর্থে এই পংক্তি ব্যবহার করলেও আগামী বিধানসভা নির্বাচনে এই কুকথাকে আশ্রয় করেই পাল্টা রাজনৈতিকভাবে শাসক দলকে চাপে রাখতে চায় রাজ্য বিজেপি। আপাতত কুকথাই বিজেপির কোরামিন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মূলত ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে আসন সংখ্যা ২ থেকে ১৮ পৌঁছনোর রোড ম্যাপকেই ফের ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে ফিরিয়ে আনতে চায় রাজ্য বিজেপি। আর সে কারণেই ইদানিং রাজ্য রাজনীতিতে ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে ‘ কুকথায় পঞ্চমুখ’ বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলে মনে করা হচ্ছে।
মূলত, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়জয়াকারের পর হতোদ্যম বিজেপি নেতা-কর্মীদের পালে হওয়া যোগাতে নানারকম ভাবে উত্তেজক তথা উস্কানিমূলক এবং কুকথার আশ্রয় নিয়েছিলেন তৎকালীন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ। যেখানে তৃণমূল নেতাকর্মী বা মন্ত্রীরা উত্তেজক বক্তব্য রেখেছেন সেখানেই পাল্টা হিসেবে দিলীপ ঘোষ সশরীরে পৌঁছে তোপ দেখেছেন শাসকদলকে এবং তাদের নেতা-কর্মীদের। হাতিয়ার হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন কুকথাকেই। কখনো বলেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের হাত-পা কেটে ফেলবেন, কোথাও বলেছেন শাসকদলের নেতারা ভোট চাইতে এলে মহিলারা হাতে ঝাঁটা-বটি-খুন্তি রাখবেন আর পুরুষরা চেরা বাঁশ হাতে রাখবেন। শাসক দলের পক্ষ থেকে যদি মারধরের কথা উল্লেখ করা হয় তার পাল্টা হিসেবে দিলীপের দাওয়াই ছিল ‘ বুকের উপর পা তোলা’ অথবা ‘জিভ কেটে ফেলা’। ইঁট ছুড়লে পাটকেল মারতে হবে এই নীতিতেই তখন দলীয় নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন রাজ্য বিজেপি সভাপতি। ২০১৯ এ ভোটের ফল বিজেপিকে উৎসাহিত করেছে সে কথা হলপ করেই বলা যায়। কিন্তু ২০১৯ পরবর্তী সময় যেভাবে রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে এবং মহিলা ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার একের পর এক যেভাবে সরকারি প্রকল্প তৈরি করেছেন সেই অনুযায়ী ২০১৯ এর রাজনৈতিক ফর্মুলা ২০২৬ এ কতটা উপযুক্ত হবে সে নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে ২০১৯ এ বিজেপির আসন সংখ্যা প্রায় ১০ গুন বৃদ্ধি পেলেও একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তা কিন্তু কাজে আসেনি। এই মধ্যবর্তী সময় রাজ্য সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্য সাথী, সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী, দুয়ারে সরকার প্রকল্প ইত্যাদি নানাবিধ সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে
মহিলাদের উন্নয়ন ও ক্ষমতা বাড়িয়ে এবং সার্বিকভাবে আত্মসামাজিক মানোন্নয়ন করে একদিকে যেমন রাজ্যের মহিলাদের কাছে জনপ্রিয়তা বেড়েছে তৃণমূলের তেমনি সাধারণ মানুষের ভোটব্যাঙ্কেও তার সুফল পেয়েছে রাজ্যের শাসকদল। প্রকৃতপক্ষে লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্প যতটা তৃণমূল কে ভোটের বাক্সে লক্ষ্মী লাভ করিয়েছে তেমনি কুকথা এবং আগ্রাসী রাজনীতির ফলে ভোটবাক্সে বিজেপির লক্ষ্মীলাভ দূরস্থ অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে বিজেপিকে। বিজেপির অন্দরেও এ ধরনের কু কথার রাজনীতিকে নেতিবাচক বলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। যার যিনি খোদ দিলীপ ঘোষ কে রাজ্য রাজনীতির সক্রিয় ভূমিকা থেকে দূরে সরে যেতে হয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা, এক্ষেত্রে সংঘ পরিবারের প্রভাবের কথা উল্লেখ করলেও সংসদীয় রাজনীতিতে এ রাজ্যে বিজেপি যে সেভাবে দানা বাঁধতে পারেনি সেকথা বলাই বাহুল্য।
গত এক সপ্তাহ ধরে রাজ্য রাজনীতিতে ফের স্বমহিমায় দিলীপ ঘোষ। মহিলাদের গলা টিপে ধরার কথা, পূতনা-সুর্পনখা বলে কটুক্তি করা, কখনো বা দা হাতে পাল্টা হুঁশিয়ারির চেষ্টা এবং বিভিন্ন রকম উত্তেজক ও অসম্মানজনক বক্তব্যে ফের শিরোনামে দিলীপ ঘোষ। আর তাকে সমর্থন করে আসরে পাল্টা রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে চাইছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি আবার আরো একধাপ এগিয়ে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির দাবি করেছেন। যদিও কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব বার শীর্ষ নেতৃত্ব আগেই জানিয়ে দিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে ঘুরপথে ক্ষমতা দখল করতে চায় না বিজেপি। এমনকি, জোর করে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসার কথা অস্বীকার করেছেন অমিত শাহ। শুভেন্দু অধিকারী এই যুক্তি কতটা যুক্তি-গ্রাহ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সর্বোপরি নতুনভাবে রাজ্য রাজনীতিতে আচমকায় সক্রিয় হয়ে ওঠা, দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে যেভাবে প্রতিদিন রাজনৈতিক বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং মহিলাদের অসম্মানের বিষয়টি যেভাবে সাধারণ মানুষের চর্চায় রয়েছে সেক্ষেত্রে বর্তমান রাজ্য ও রাজনীতি প্রেক্ষিতে বিজেপি কতটা লাভবান হবে? মহিলা ভোটব্যাংক যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম রাজনৈতিক অস্ত্র তা রাজনীতিতে যারা শিক্ষানবিশ তারাও একবাক্যে স্বীকার করেন। তা সত্ত্বেও রাজ্য রাজনীতিতে মহিলাদের প্রতি কটুক্তি বা অসম্মান কিংবা দিলীপ ঘোষের এই কু কথার রাজনৈতিক কৌশল বিরোধী দল বিজেপিকে কতটা রাজনৈতিক এডভান্টেজ দেবে সে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যায়। রাজ্য বিজেপির অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছে প্রতি আক্রমণ করতে গিয়ে একজন প্রাতিষ্ঠানিক নেতাকে ভাষা সংযত রাখতে হবে। কারণ তার বক্তব্যের উপরেই শুধু তার ব্যক্তিগত রুচি নয় দলের রাজনৈতিক রুচিবোধেরও পরিচয় ফুটে ওঠে। সে ক্ষেত্রে দিলীপ ঘোষের মতো দায়িত্ববান নেতৃত্ব যদি কুকথার ফুলঝুরি সামনে রেখে এবং মহিলাদের কটুক্তি করে নির্বাচনী ফললাভ করতে চান তাহলে তা বর্তমান বাংলার রাজনীতিতে নেতিবাচক হিসেবেই প্রতিফলিত হবে। সর্বোপরি দিলীপ-শুভেন্দুর এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলার রাজনীতিতে প্রকারান্তরে তৃণমূলকেই আরও জমি শক্ত করতে সুবিধা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
