ভারতীয় সঙ্গীত জগতে অরিজিৎ সিং আজ এক পরিচিত নাম। তাঁর কণ্ঠের আবেগ, সুরের গভীরতা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছে বছরের পর বছর। তবে তাঁর যাত্রাপথ শুধুই সাফল্যের গল্প নয়, এর মাঝে আছে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ, বন্ধুত্বের উত্থান-পতন এবং এক বিস্মৃত প্রতিভার হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি—রূপরেখা বন্দ্যোপাধ্যায়।
২০০৫ সালে রিয়েলিটি শো ‘ফেম গুরুকুল’-এর মাধ্যমে আলোচনায় আসেন অরিজিৎ সিং। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় রূপরেখা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, যিনি ছিলেন প্রতিযোগিতার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা। সুরের টানে তাঁদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়, যা পরবর্তীতে সম্পর্কে রূপ নেয়। তবে এই বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক শুধুমাত্র দু’জন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এক জটিল অধ্যায়ে পরিণত হয়।
অরিজিৎ ও রূপরেখার ঘনিষ্ঠতা একসময় বিয়েতে রূপ নেয়, তবে তাঁদের দাম্পত্য সুখকর হয়নি। ২০১৩ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। যদিও ব্যক্তিগত সম্পর্কের এসব অধ্যায় নিয়ে অরিজিৎ কখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, তবে তাঁদের বিচ্ছেদ নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়ায়। অনেকেই বলেন, বিশ্বাসের সংকট তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরায়।
বিচ্ছেদের পর অরিজিৎ ২০১৪ সালে কোয়েল রায়ের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন এবং তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কিন্তু রূপরেখার জীবন ধীরে ধীরে সঙ্গীতের জগৎ থেকে দূরে সরে যায়। তিনি কি নিজেই ইন্ডাস্ট্রি থেকে সরে গিয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? প্রশ্নটা থেকেই যায়।
অনেকের ধারণা ছিল, ব্যক্তিগত জীবনের এই টানাপোড়েন অরিজিতের ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। ২০১৩-১৪ সালের সময়েই তিনি ‘তুম হি হো’ (আশিকি ২), ‘ফির লে আয়া দিল’ (বরফি), ‘লাল ইশক’ (গোলিয়োঁ কি রাসলীলা: রামলীলা)-র মতো সুপারহিট গান উপহার দেন। এই গানগুলো তাঁকে বলিউডের প্রথম সারির গায়কদের তালিকায় এনে দেয়।
অপরদিকে, রূপরেখার কেরিয়ার ক্রমশ ম্লান হতে থাকে। যাঁরা একসময় তাঁর কণ্ঠের মাধুর্যে মুগ্ধ ছিলেন, তাঁরাও ধীরে ধীরে ভুলতে বসেন এই প্রতিভাবান শিল্পীকে। অনেকেই মনে করেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তনই এই অন্তর্ধানের মূল কারণ। তবে এটাও বলা হয়, রূপরেখা কখনোই স্পটলাইটে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। হয়তো তিনি ইচ্ছা করেই নিজেকে সঙ্গীতজগৎ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
আজকের দিনে অরিজিৎ সিং ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক, কিন্তু তাঁর সাফল্যের গল্পে রূপরেখার ছায়া রয়ে গেছে। হয়তো একসময় তাঁরা একে অপরের প্রেরণা ছিলেন, হয়তো তাঁদের বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে।
রূপরেখার সঙ্গীতজীবন হারিয়ে গেলেও তাঁর প্রতিভা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর অরিজিৎ? তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোও সাফল্যের সিঁড়ি হতে পারে। তাঁদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনে সম্পর্ক ও ক্যারিয়ার কখনো সরল পথে চলে না, মাঝেমধ্যে কিছু অপূর্ণতা থেকেই যায়।
