সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বীমা দাবির বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছে। আদালত জানিয়েছে, বীমা গ্রহণকারী ব্যক্তি যদি মদ্যপানের অভ্যাস সম্পর্কে তথ্য গোপন করেন এবং পরবর্তীতে সেই কারণে কোনো দুর্ঘটনা বা মৃত্যু ঘটে, তাহলে বীমা সংস্থা সেই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এই রায় বীমা সংক্রান্ত নিয়ম এবং গ্রাহকের স্বচ্ছতার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি জীবন বীমা দাবির মামলা থেকে। এক ব্যক্তি জীবন বীমা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। পলিসি গ্রহণের সময় তিনি তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য প্রদান করেছিলেন, তবে তিনি মদ্যপানের বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পরিবার বীমা দাবি করলে বীমা সংস্থা তা প্রত্যাখ্যান করে। সংস্থার যুক্তি ছিল, মদ্যপানের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং বীমা গ্রহণের সময় এই তথ্য গোপন করা হয়েছিল।
পরিবারটি প্রথমে নিম্ন আদালতে মামলা করে। নিম্ন আদালত বীমা সংস্থার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। এরপর তারা উচ্চ আদালতে আপিল করে। অবশেষে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, বীমা গ্রহণের সময় মদ্যপানের তথ্য গোপন করা বীমা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করার সমান। আদালত জানিয়েছে, বীমা সংস্থার কাছে গ্রাহকের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বীমার শর্তাবলী এবং প্রিমিয়ামের হার নির্ধারিত হয়।
বিচারপতিরা বলেছেন, ‘‘যদি বীমা গ্রহণকারী ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা অসাবধানতাবশত মদ্যপানের বিষয়টি গোপন করেন, তাহলে তা বীমা সংস্থার বিরুদ্ধে প্রতারণার শামিল। এতে করে সংস্থার আর্থিক ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এই অবস্থায় বীমা সংস্থা দাবিকে প্রত্যাখ্যান করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখে।’’
সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছে যে, বীমা গ্রহণের সময় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য স্বচ্ছভাবে জানানো বাধ্যতামূলক। মদ্যপানের মতো বিষয় গোপন রাখলে তা বীমার শর্ত ভঙ্গ করার সামিল এবং বীমা সংস্থা সেই ভিত্তিতে দাবি বাতিল করতে পারে।
বীমা সংস্থাগুলি বরাবরই দাবি করে এসেছে যে, গ্রাহক যদি বীমা গ্রহণের সময় তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেন, তাহলে সেটি প্রতারণা হিসাবে বিবেচিত হবে। মদ্যপান এবং ধূমপানের মতো অভ্যাসগুলির বিষয়ে গোপনীয়তা বীমা সংস্থার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কারণ, এগুলি স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে এবং মৃত্যু বা অসুস্থতার সম্ভাবনা বাড়ায়।
বীমা সংস্থাগুলির বক্তব্য হল, বীমার চুক্তি হল বিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত। গ্রাহক যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মদ্যপানের তথ্য গোপন করেন এবং পরবর্তীতে সেটি দুর্ঘটনার কারণ হয়, তাহলে বীমা সংস্থার ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই এই ধরনের গোপন তথ্য প্রকাশ না করাকে প্রতারণা হিসাবে গণ্য করা হবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় বীমা গ্রাহকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। গ্রাহকদের সতর্কভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে বীমা গ্রহণের সময় তাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য বীমা সংস্থার কাছে জানানো উচিত। মদ্যপানের মতো অভ্যাস গোপন করলে পরবর্তীতে সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমার চুক্তি স্বচ্ছতা ও সততার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। মদ্যপান, ধূমপান বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা আইনের পরিপন্থী। বীমা গ্রহণের সময় সমস্ত তথ্য স্পষ্টভাবে জানালে ভবিষ্যতে সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।
বীমা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা গ্রাহকদের পরামর্শ দিচ্ছেন যে, বীমার চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সমস্ত শর্ত ভালোভাবে পড়ে নেওয়া উচিত। মদ্যপান বা অন্য কোনো অভ্যাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করা বাধ্যতামূলক। যদি গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেন, তাহলে বীমা সংস্থা বৈধভাবে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভবিষ্যতে বীমা সংস্থাগুলিকে তাদের নীতি আরও কড়া করতে উৎসাহিত করবে। একইসঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যেও বীমা গ্রহণের সময় স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করবে।

