চিনি খাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অনেকেই মনে করেন, চিনি শরীরের জন্য ক্ষতিকর, আবার কেউ বলেন, পরিমাণ মতো চিনি খাওয়া তেমন ক্ষতি করে না। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিনির উপকারিতা এবং ক্ষতি দুটিই রয়েছে। চিনি আমাদের খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
চিনি মূলত সরল কার্বোহাইড্রেট, যা শরীরে দ্রুত গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয় এবং তাৎক্ষণিক শক্তি যোগায়। ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করলে অল্প পরিমাণ চিনি দ্রুত এনার্জি বাড়াতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে গ্লুকোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিনি থেকে যে গ্লুকোজ তৈরি হয়, তা মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্লুকোজের অভাবে মনোযোগ কমে যেতে পারে এবং মানসিক অবসাদ দেখা দিতে পারে। তাই স্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে নির্দিষ্ট পরিমাণ চিনি প্রয়োজন।
চিনি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বিশেষত, নিম্ন রক্তচাপের সমস্যা থাকলে হঠাৎ চিনি খেলে তা সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। শরীরচর্চা বা কঠোর পরিশ্রমের সময় চিনি শরীরে গ্লাইকোজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দ্রুত শক্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। এটি ক্রীড়াবিদদের জন্য উপকারী। শরীরচর্চার আগে বা পরে চিনি খেলে দ্রুত শক্তি ফিরে পাওয়া যায়।
তবে চিনির অতিরিক্ত গ্রহণ শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ফলে শরীরে ফ্যাট জমে, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়। অতিরিক্ত ওজন শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি করে, যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হলে শরীর রক্তে থাকা গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।
চিনি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড এবং খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা বেড়ে যায়, যা ধমনীর মধ্যে চর্বি জমার সৃষ্টি করে। এর ফলে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মুখের স্বাস্থ্যের ওপরও চিনির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনির সংস্পর্শে এসে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের ক্ষয় ঘটায়। দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে গর্ত (ক্যাভিটি) সৃষ্টি করে।
ত্বকের ওপরও চিনির নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অতিরিক্ত চিনি খেলে শরীরে গ্লাইকেশন নামক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা ত্বকের কোলাজেন এবং ইলাস্টিনের গঠন নষ্ট করে। ফলে ত্বক তার স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা হারায় এবং বলিরেখা দেখা দেয়। ব্রণ এবং অন্যান্য চামড়ার সমস্যা বাড়ার পেছনেও অতিরিক্ত চিনির ভূমিকা রয়েছে।
চিনি খাওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দিনে ২৫-৩০ গ্রাম (প্রায় ৬ চা চামচ) চিনি গ্রহণ করা নিরাপদ। তবে যাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা স্থূলতার সমস্যা রয়েছে, তাদের অবশ্যই চিনির পরিমাণ আরও কমানো উচিত। প্রাকৃতিক উৎস যেমন মধু, ফল এবং গুড় থেকে চিনি গ্রহণ করাই ভালো। প্রাকৃতিক চিনি শরীরে ধীরে গ্লুকোজ সরবরাহ করে এবং ইনসুলিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয় এবং প্যাকেটজাত খাবারে প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত চিনি থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই এই ধরনের খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। অনেকেই চিনির বিকল্প হিসাবে স্টেভিয়া, খেজুর সিরাপ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক মিষ্টিজাত উপাদান ব্যবহার করেন। এগুলি সাধারণত কম ক্ষতিকর এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া যেমন উপকারী নয়, তেমনি অতিরিক্ত চিনি গ্রহণও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালান্সড ডায়েট এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে চিনি গ্রহণের নেতিবাচক প্রভাব কমানো সম্ভব।
সঠিক পরিমাণে চিনি গ্রহণ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিমিত চিনি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং প্রাকৃতিক উৎস থেকে চিনি গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা।
