নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শুক্রবার রাজতন্ত্র সমর্থকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজতন্ত্র ও হিন্দু রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে, যা একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পাথর ছুঁড়তে শুরু করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে, তবে তাতেও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে বেশ কয়েকটি বাড়ি, ভবন ও যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের পরিণতিতে রাজধানীর তিনকুনে, সিনামঙ্গল ও কোটেশ্বর এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালীন একটি ব্যবসায়িক কমপ্লেক্স, একটি শপিং মল, একটি রাজনৈতিক দলের সদর দপ্তর এবং একটি মিডিয়া হাউস ভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই সহিংসতার ঘটনায় ১২ জনেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। রাজতন্ত্রপন্থী দল রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (RPP) এবং আরও কয়েকটি সংগঠন এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়। বিক্ষোভকারীরা রাজতন্ত্রপন্থী জাতীয় পতাকা বহন করে এবং প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের ছবি হাতে নিয়ে শ্লোগান দেয়। তারা ‘রাজা আসুন, দেশ বাঁচান’ এবং ‘আমরা রাজতন্ত্র ফিরে চাই’ বলে আওয়াজ তোলে, যা শহরজুড়ে উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয় ২০০৮ সালে, যখন সংসদীয় ঘোষণার মাধ্যমে ২৪০ বছরের পুরনো শাসনব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, ফেডারেল, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার হয়েছে। বিশেষত, গত মাসের ১৯ ফেব্রুয়ারি গণতন্ত্র দিবসে এক ভিডিও বার্তায় প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ জনগণের প্রতি তার সমর্থনের আবেদন জানানোর পর এই আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর থেকে রাজতন্ত্র সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন শহরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মাসের শুরুতে, নেপালের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন শেষে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের সমর্থকরা তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং ব্যাপক সমাবেশ করেন। এতে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি আরও প্রবল হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অর্থনৈতিক সংকট জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে, যা রাজতন্ত্রপন্থী আবেগের পুনরুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ। আন্দোলন কতদূর গড়াবে এবং সরকার কিভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
