ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়: ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি
অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং একটি রহস্যময় মৃত্যু...ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা
দৃষ্টিকুন্ডু :
স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের সন্ধান মেলে, যাঁদের সিদ্ধান্ত এবং আদর্শ দেশের ভবিষ্যৎ মানচিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁদেরই অন্যতম ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আজ ২৩ শে জুন। ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা তথা বাংলার কৃতী সন্তান ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ দিবস।
১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে যাঁর জন্ম, তিনি কেবল একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন এক প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদও। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীনোত্তর ভারতের শিল্পায়নেরও অন্যতম রূপকার ছিলেন। জহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভায় দেশের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীকালে আদর্শগত মতপার্থক্য এবং কাশ্মীর নীতি ও পাকিস্তান প্রশ্নে নেহরু সরকারের সঙ্গে দূরত্বের জেরে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারতীয় জনসংঘ’, যা আজকের ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মূল আদর্শিক ভিত্তি।
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরতা এবং অখণ্ড ভারতের যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও দেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক। তবে তাঁর এই বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল এমন এক পরিস্থিতিতে, যা দীর্ঘ সাত দশক পার হয়েও ভারতের ইতিহাসের পাতায় এক গভীর রহস্য এবং বিতর্কের অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
কাশ্মীরের আন্দোলন এবং বন্দিদশা
বিতর্কের সূত্রপাত ১৯৫৩ সালের মে মাসে। তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় নাগরিকদের প্রবেশের জন্য একটি বিশেষ ‘পারমিট প্রথা’ চালু ছিল। ড. মুখোপাধ্যায় এই ব্যবস্থার তীব্র বিরোধী ছিলেন। তাঁর স্লোগান ছিল— "এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান আর দুই নিশান চলবে না।" এই ‘পারমিট প্রথা’ ভেঙে কাশ্মীরে প্রবেশ করার জেদ নিয়েই ১৯৫৩ সালের মে মাসে তিনি শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু সীমান্ত পার করার পরেই তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের নির্দেশে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং শ্রীনগরের একটি বন্দিশিবিরে আটক করে রাখা হয়।
২৩ জুনের সেই অভিশপ্ত সকাল
বন্দিদশায় থাকাকালীনই ড. মুখোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন গভীর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তৎকালীন সরকারি ও মেডিকেল রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণেই তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণ। প্রশাসন বিষয়টিকে একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা হিসেবেই তুলে ধরেছিল।
প্রশ্ন, বিতর্ক এবং দীর্ঘায়িত ধোঁয়াশা
কিন্তু এই মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ড. মুখোপাধ্যায়ের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর মা যোগমায়া দেবী এবং তৎকালীন জনসংঘের নেতারা সরাসরি অভিযোগ তোলেন, বন্দিদশায় তাঁর চিকিৎসায় চরম অবহেলা করা হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, একজন হৃদ্রোগীকে যে ধরনের জরুরি চিকিৎসা দেওয়া উচিত ছিল, তা সময়মতো দেওয়া হয়নি। সময়ের সাথে সাথে এই অভিযোগ আরও তীব্র রূপ নেয় এবং বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমর্থক একে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করতে শুরু করেন। দাবি ওঠে, স্বাধীন ভারতের এক অন্যতম শীর্ষ বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতেই কি এই অবহেলা?
যদিও এই দীর্ঘ সাত দশকে ভারতের শাসনক্ষমতায় বহু পরিবর্তন এসেছে, তা সত্ত্বেও এই রহস্যের জট পুরোপুরি খোলেনি। আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি তদন্ত, বিচারবিভাগীয় কমিশন বা আইনি প্রক্রিয়ায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে আইনিভাবে ‘হত্যাকাণ্ড’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা যায়নি। ফলে, তথ্যের অভাব এবং প্রমাণের অনুপস্থিতিতে এই ঘটনাটি আজও এক বড় রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় বন্দি।
সমকালীন রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ এবং তাঁর এই রহস্যময় মৃত্যু— দুই-ই বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিজেপি এবং তার সমাদর্শী সংগঠনগুলোর কাছে তিনি জাতীয়তাবাদের এক অবিসংবাদিত প্রতীক। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ বা জাতীয় সংহতির যেকোনো আলোচনাতেই তাঁর নাম অবধারিতভাবে ফিরে আসে।
ইতিহাসের কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ের গর্ভেই হারিয়ে যায়। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুও তেমনই এক অমীমাংসিত প্রশ্নচিহ্ন, যা প্রতি বছর ২৩ জুন এলেই ভারতীয় রাজনীতির অলিন্দে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তোলে। তবে মৃত্যুর ধোঁয়াশা সরিয়ে রাখলেও, ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনার ইতিহাসে তাঁর অবদান যে চিরকাল অক্ষয় থাকবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে দেশজুড়ে নতুন করে চর্চায় তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও অখণ্ড ভারতের জাতীয়তাবাদী ভাবনা।