বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রে বাজেট পেশের আগে অর্থমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতির দই-চিনি খাওয়ানোর প্রথা চেনা ছবি। তবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক অলিন্দে এই সংস্কৃতির চল ছিল না। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানা বা পরবর্তী ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনেও এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার গঠনের পর নবান্নের সেই চেনা পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতীয় সংস্কৃতি এবং শিক্ষা-দীক্ষা কে নতুন ভাবে সারাবিশ্বে প্রসার এবং প্রচারের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে বিজেপি সরকার।
সোমবার বিধানসভায় বাজেট পেশের ঠিক আগে নবান্নে সনাতন প্রথা মেনে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে নিজের হাতে দই-চিনি খাইয়ে শুভকামনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এখানেই শেষ নয়, বিকেলে বাজেট পর্ব মিটতেই এক নজিরবিহীন দৃশ্যের সাক্ষী হয় অর্থ দফতর। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিশাল এক মিষ্টির বাক্স হাতে হাজির হন অর্থ দফতরে। দফতরের সমস্ত কর্মী ও অফিসারদের নিজের হাতে মিষ্টি খাওয়ান। অর্থ দফতরের এক প্রবীণ অফিসারের কথায়, "চাকরি জীবনে এমন অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুধু মিষ্টিই খাওয়াননি, মুখ্য সচিবকে পাশে বসিয়ে আমাদের সঙ্গে হালকা মেজাজে আড্ডাও দিয়েছেন।"
প্রশাসনিক কার্যপদ্ধতিও ধীরে ধীরে খোলনলচে বদলাচ্ছে। গত পনেরো বছরের প্রশাসনিক অবকাঠামোয় যেখানে সরকারি আমলা এবং কর্মীদের যথাযথ সম্মান এবং মূল্যায়ন হয়নি,সেখানে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রী প্রথম থেকেই সকলকে সম্মান এবং পদমর্যাদার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে চলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর এক ভিন্ন প্রশাসনিক দর্শন তুলে ধরছেন। অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগত স্তরে স্নেহশীল হলেও, সরকারি কর্মীদের যথাযথ সামাজিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা না দেওয়ার একটা ক্ষোভ সচিবালয়ের অন্দরে ছিল। প্রশাসনিক বৈঠকে সিনিয়র আমলাদের 'তুমি' সম্বোধন করা কিংবা ডিএ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তাঁর করা মন্তব্য 'ঘেউ ঘেউ করবেন না' তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
এই মতাদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীতপন্থী হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সকল সরকারী কর্মকর্তা এবং কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বার্তা দিয়েছেন--
"আপনারা পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে কাজ করুন। কাউকে 'তুমি' বলে প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা আমার সংস্কৃতি নয়। তবে কাজে ত্রুটি হলে কড়া কৈফিয়ত চাইতে ছাড়ব না।"
ঠিক এই জায়গাতেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী এক বড়সড় পরিবর্তন এনেছেন। নবান্নে এখন ছোট-বড় সব কর্মচারী ও অফিসারদের 'আপনি' সম্বোধন ছাড়া তিনি কথা বলেন না। ক্ষমতা হস্তান্তরের পাশাপাশি নবান্নের দীর্ঘদিনের চেনা প্রশাসনিক 'টোন' এবং সংস্কৃতিটাকেও বদলে দিতে চাইছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী, বাজেটকে কেন্দ্র করে এই সৌজন্যের আবহ তারই বড় প্রমাণ।
নবান্নে 'দই-চিনি' থেকে 'আপনি' সম্বোধনের নতুন অধ্যায় সাবহেড: প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে বদলের ছোঁয়া