বৃহস্পতিবার দুপুরে এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক তাণ্ডবের সাক্ষী থাকল কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি। সকালের তীব্র, হাঁসফাঁস করা ভ্যাপসা গরমের পর দুপুরের দিকে আচমকাই আবহাওয়া আমূল বদলে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ নিকষ কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে নেমে আসে অন্ধকার। শুরু হয় ঝোড়ো হাওয়া এবং মুষলধারে বৃষ্টি। তবে সবচেয়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায় মুহুর্মুহু কানফাটানো বজ্রপাত। সাম্প্রতিক অতীতে মহানগরে এত তীব্র ও ঘনঘন বাজ পড়ার ঘটনা ঘটেনি। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে শহরের বহুতলগুলি; পথচারী ও নিত্যযাত্রীরা প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটেন। এই দুর্যোগের জেরে ধর্মতলা, পার্ক স্ট্রিট, ময়দান ও হাইকোর্ট চত্বরের মতো ব্যস্ততম এলাকায় জনজীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায় এবং রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
কলকাতা ছাড়াও হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা ও নদিয়াতেও এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আছড়ে পড়ে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, একাধিক বায়ুমণ্ডলীয় সিস্টেমের যৌথ প্রভাবেই এই চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।উত্তর বিহার থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি সক্রিয় নিম্নচাপ অক্ষরেখা ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের ওপর বিস্তৃত রয়েছে। পাশাপাশি রাজস্থান থেকে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে মৌসুমী অক্ষরেখা। অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশ সংলগ্ন এলাকায় একটি শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্ত অবস্থান করছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছে মরশুমের প্রথম ঘূর্ণাবর্ত।
এই জোড়া ঘূর্ণাবর্তের টানে সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প হু হু করে স্থলভাগে প্রবেশ করছে। স্থানীয় অত্যধিক গরম এবং এই জলীয় বাষ্পের মিলনে কলকাতার আকাশে অত্যন্ত দ্রুত ‘বজ্রগর্ভ মেঘ’ বা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হচ্ছে, যা এই নজিরবিহীন বজ্রপাতের মূল কারণ।টানা কয়েক দিনের এই ঝড়-বৃষ্টিতে ভ্যাপসা গরম থেকে মুক্তি মিললেও এখনই স্বস্তি পাচ্ছে না রাজ্যবাসী।
আগামী সোমবার (২৯ জুন) পর্যন্ত কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে ৩০ থেকে ৫০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির কারণে ‘হলুদ সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনা, দুই বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও পূর্ব মেদিনীপুরে প্রবল বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে।উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক। সেখানে অতিভারী বৃষ্টির জেরে তিস্তা, তোর্সা, বালসনের মতো পার্বত্য নদীগুলির জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারে আগামী সোমবার পর্যন্ত ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার বা তারও বেশি রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টির পূর্বাভাসের কারণে ‘লাল ও কমলা সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধস নামার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তাল সমুদ্রের কারণে উত্তর ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। তাই মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের স্পষ্ট নির্দেশ, বজ্রপাতের সময় কেউ যেন খোলা আকাশের নীচে না থাকেন এবং পাকা বাড়ির ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করেন।
প্রাকৃতিক তাণ্ডবের সাক্ষী মহানগর সহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ