২০২৪ সালের অগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গোটা বিশ্ব দেখেছে এক অন্য বাংলাদেশের ছবি। গোটাদেশ জুড়ে শুরু হয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিশেষ করে হিন্দুদের উপর হামলা। বিভিন্ন জেলায়, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য, তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে ব্যাপক হামলা শুরু হয়। হত্যাকান্ডের পাশাপাশি লাগাম ছাড়া হিংসা ছড়িয়ে পড়ে।
এমন পরিস্থিতি নিয়ে পড়শি দেশ হিসেবে তখনই উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত। এবার তা শোনা গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ডের কথায়। ভারতে গোয়েন্দাদের এক সম্মেলনে অংশ নিতে এসে তিনি বলেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে বলেন যে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যাপী ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদ’ থামাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসি গ্যাবার্ড বলেছেন, “হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের দুর্ভাগ্যজনক নিপীড়ন, হত্যা ও নির্যাতন মার্কিন সরকার এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।” এর পরেই তিনি জানান যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশে ইসলামিক চরমপন্থা ও সন্ত্রাসী উপাদানের উত্থানের কথাও বলেছেন।
বাংলাদেশে যেরকম ভয়াবহ ভাবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে তা নিয়ে গত ডিসেম্বরেই আশঙ্কা প্রকাশ করে ভারতের বিদেশমন্ত্রক। রাজ্যসভায় বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে চলা হিন্দুদের উপর অত্যাচারের ঘটনায় একটি রিপোর্টে পেশ করেন। সেই রিপোর্টে যেখানে বাংলাদেশে অত্যাচারের ঘটনার সংখ্যা ২২০০টি এবং পাকিস্তানে তা মাত্র ১১২টি। ২০২২ সালে দায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের সংখ্যা ছিল ৪৭টি। আর এ বছর সরকার বদলের পরই সেই সংখ্যা এক লাফে ছাড়িয়েছে দু’হাজারের গণ্ডি। অবশ্য এই সমীক্ষার বাইরেও আরও অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। পালাবদলের পর থেকে এভাবেই সংখ্যালঘুদের অত্যাচারের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।
এই সাক্ষাৎকারে তুলসি গ্যাবার্ড ‘ইসলামিক খিলাফত’ এর মতাদর্শ এবং কীভাবে বিশ্বব্যাপী চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলি একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কাজ করে তা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “ইসলামিস্ট সন্ত্রাসীদের হুমকি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এই চেষ্টা একই মতাদর্শ ও উদ্দেশ্যে নিহিত – যা হল একটি ইসলামিস্ট খিলাফত দিয়ে শাসন করা।”
সাক্ষাৎকারে গ্যাবার্ড বলেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মতাদর্শ চিহ্নিত করে তা থামাতে এবং তিনি যাকে “মৌলবাদী ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ” বলে অভিহিত করেন তার উত্থান বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশে হিংসা ও ধর্মীয় নিপীড়ন ছাড়াও, পাকিস্তানের কুখ্যাত আইএসআই-এর সঙ্গে এর ক্রমবর্ধমান সমন্বয় গত দুই মাসে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী জানান যে তিনি বাংলাদেশের ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল, বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডোরে আইএসআই কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে দেখা করলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হয়। এই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান যে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সামলাতে দেবেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, “এটি এমন কিছু যা প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। সত্যি বলতে, আমি এটি সম্পর্কে পড়ছি। আমি বাংলাদেশকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছেড়ে দেব।” সেইসময় এই নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের বিষয়টি ট্রাম্প হালকা ভাবে নেন নি তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসি গ্যাবার্ডের কথাতেই স্পষ্ট।
Leave a comment
Leave a comment
