বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা “রাজনৈতিক টার্গেট” বললেন মুখ্যমন্ত্রী
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সুপ্রিম কোর্টের রায় হৃদয়বিদারক, তবু হৃদয় দিয়েই আমরা প্রায় ২৬ হাজার এস এস সি চাকরিহারাদের জীবনের সুরক্ষার রাস্তা খুঁজব। ২০১৬ এসএসসি নিয়োগ প্যানেল বাতিল সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রেক্ষিতে ই এভাবেই নিজের বক্তব্য জানালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। “রায় আমাদের বিরুদ্ধে গেছে ঠিকই কিন্তু সেখানে আমাদের রাস্তাও খুলে দেওয়া আছে। সুপ্রিম কোর্ট যে তিন মাসের সময়সীমা দিয়েছে সেই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই আমরা সমস্যার সমাধান করব।” মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আদালতের নির্দেশকে শিরোধার্য করেই রাজ্য সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ করবে এ কথা জানালেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং একজন দেশবাসী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মেনে নেওয়া যায় না বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বঞ্চিত হওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকারা দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছেন। যদি সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর কোন ঘটনা ঘটে তাহলে তার দায় কে নেবে? প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০১৬ সালের পর এই সময়কালের মধ্যে তাদেরকেও বাড়ি করেছেন গাড়ি কিনেছেন ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছেন বাচ্চাদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। বাড়ির বয়স্কদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রচুর ব্যয় করেছেন। এই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে কোন ঘটনা ঘটলে পরিবারগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। কয়েক লক্ষ মানুষ আদালতের এই রায়ের প্রেক্ষিতে আক্রান্ত হবেন। সার্বিক পরিস্থিতির দায় কে নেবে? সেই প্রশ্নও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর বরাভয় ” যারা বঞ্চনার শিকার তাদের তাদের পাশে আমরা আছি। তাতে যদি বিজেপি আমাকে জেলে পাঠায় পাঠাক, আমি প্রস্তুত।”
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে ২৫ হাজার ৭৫৩ জনের প্যানেল সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছে তার মধ্যে ১১ হাজার ৬১০ জন নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষক এবং ৫৬১০ জন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষক রয়েছেন। ইতিমধ্যেই তাদের অধিকাংশ মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতাও দেখছেন। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই শিক্ষকদের মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে থাকবে তা সহজেই অনুমেয়। আর এখানেই বাংলাকে টার্গেট করার রাজনৈতিক অভিসন্ধি খুঁজে পাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই পরিস্থিতির জন্য বিজেপি এবং সিপিএমকে কাঠগড়ায় তুলেছেন মমতা। তার বক্তব্য, বাংলাকে টার্গেট করেই এই রাজনৈতিক অভিসন্ধি করা হয়েছে যাতে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থাকে দমিয়ে রাখা যায়। বাংলার মেধাকে এরা ভয় পায় তাই মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম দুর্নীতি এবং পঞ্চাশ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাম আমলে এরা যে চিরকুট দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি হয়েছে। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ মমতার। এসএসসি মামলায় মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিপিআইএমের রাজ্যসভা সংসদ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। বিকাশ বাবুর নাম উল্লেখ করে কটাক্ষের সুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন ” বিকাশ বাবুর নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত”। পাশাপাশি হাইকোর্টের যে বিচারপতির হাত ধরে এসএসসি মামলার শুরু সেই অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বর্তমানে আইনজগৎ ছেড়ে বিজেপির সাংসদ। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ না করেও কটাকে সুরে মমতা বলেন ” ওই গান না ডাং কে ছিলেন তিনি তো এখন বিজেপির সংসদ তাহলে বুঝতেই পারছেন রাজনীতিটা কোন জায়গায়।” সর্বোপরি সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার মুখ্যমন্ত্রীকেই এর জন্য দায়ী করে মন্তব্য করেছেন। অযোগ্যদের চাকরি বাঁচাতে যোগ্যদের চাকরি গেছে যার দায় মুখ্যমন্ত্রীর। এ প্রসঙ্গে মমতা বলেন ” সব সময় কেন বাংলাকে টার্গেট করা হবে আগে কেন বিচার করা হয়নি? কে যোগ্য কে অযোগ্য? কেন রাজ্যকে কোন সুযোগ দেওয়া হয়নি? আত্ম রক্ষার জন্য একটা সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। এটা কি পরিকল্পনা করে বাংলাকে টার্গেট?” মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা বক্তব্য আমাদের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে জেলে পুড়ে রাখা হয়েছে। তাহলে একই অপরাধে কতবার শাস্তি হয়? একজন কর্মরত বিচারপতির বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হলে তার ক্ষেত্রে শাস্তি যদি শুধু বদলি হয়, তাহলে এক্ষেত্রে হৃদয় বিদারক শাস্তি কেন? পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি যে মামলা ফকির রেখেছিলেন তারপরে আর একজন দেশের প্রধান বিচারপতি সেই মামলায় এই হৃদয়বিদারক রায় দিলেন। এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন ” একজন বিচারপতির ক্ষেত্রে আইন একরকম আরেকজন বিচারপতির ক্ষেত্রে আইন আরেকরকম ? আইনের বিধানে কি মানবিকতার কোন জায়গা নেই?”
বস্তুত যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিন মাসের মধ্যে পুনর নিয়োগের যে সংস্থান রাখা হয়েছে সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মানবিকভাবেই এই ২৫ হাজার ৭৫৩ চাকরির প্রার্থীরা অগ্রাধিকার পাবেন সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায় উল্লেখ করে জানিয়েছেন যারা এখনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করছেন তাদের বেতন ফেরত এর কোন নির্দেশ দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট অর্থাৎ তাদের কোন টাকা ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই নেই। তবে এই নিয়োগ দুর্নীতির ক্ষেত্রে সর্ষের মধ্যে ভূত আছে কিনা সেটাও খুঁজে দেখবেন মমতা। ২০১৬ সালে কারা কারা মন্ত্রী ছিলেন সেটা খুঁজে বের করে তাদের কাজ নিয়ে বিশ্লেষণ যেমন করা হবে তেমনি নাম না করে একটি বিশেষ জেলার এই নিয়োগ দুর্নীতির আতুর ঘর তৈরি হয়েছিল বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। সে ব্যাপারে যে রাজ্য সরকার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পথে হাঁটবে তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন রাজ্য সরকার আইন মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ করবে। যেহেতু বিষয়টি বেচারা দিন তাই এ নিয়ে আগাম কোন মন্তব্য তিনি করতে চান না। একটি স্বনিয়ন্ত্রিত সংস্থা হিসেবে এসএসসি রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, এসএসসির বিষয়ে রাজ্য সরকার আইনগতভাবেই কোনও নাক গলায় না। পরিশেষে বিজেপি ও সিপিএমকে মমতার বার্তা ” কেউ তো বেড়ালের গলায় ঘন্টা বেঁধে লাখো মানুষের এই ক্ষতি করেছে। সেজন্যই সিপিএম ও বিজেপি জেনে রাখুন আগামী দিন আপনাদের কাছে ভয়ংকর।”
